রোমে আজ ভারত-ইতালি কৌশলগত আলোচনা সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর বা IMEC এবং যৌথ কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করবেন। নিউজ অন এয়ার ও প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্য বার্তা অনুযায়ী, এই সফরের লক্ষ্য দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও গভীর করা, বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে । সফরটি এমন সময়ে হচ্ছে, যখন দুই দেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন গতি পেয়েছে।
রোমে বৈঠকের মূল এজেন্ডা
আজকের বৈঠকের কেন্দ্রে থাকবে IMEC, যা ভারতকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার একটি বৃহৎ সংযোগ প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোদির রোম সফরের ফোকাস থাকবে এই করিডরের বাস্তবায়ন, ভারতের-ইতালির বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা । একই সঙ্গে ২০২৫-২৯ সময়কালের যৌথ কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হবে, যা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে ।
প্রধানমন্ত্রীর এক্স-বার্তায় তিনি জানান, তিনি প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেলা ও প্রধানমন্ত্রী মেলোনির সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং এই সফরে ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডর, ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (FAO) সফর এবং বহুপাক্ষিকতা ও বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা থাকবে । অর্থাৎ, রোম সফরটি কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সফর নয়; বরং কৌশলগত, অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক আলোচনার সমন্বয়।
IMEC কেন গুরুত্বপূর্ণ
IMEC-কে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত কানেক্টিভিটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নীতি বিশ্লেষণভিত্তিক সূত্র অনুযায়ী, এই করিডর ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহন, জাহাজ চলাচল, লজিস্টিকস ও ডিজিটাল সংযোগে গতি আনতে পারে । এর মাধ্যমে সুয়েজ-নির্ভর রুটের বিকল্প তৈরি হলে বাণিজ্যিক সময় ও খরচ উভয়ই কমতে পারে।
ভারত-ইতালি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও IMEC প্রতীকী নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। রোমে ভারতীয় দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ইউরো ১৪.৩৪ বিলিয়ন ছিল, আর ভারতীয় রপ্তানি ছিল ইউরো ৯.১৬ বিলিয়ন । সেই প্রেক্ষাপটে করিডর, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলিকে একযোগে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা দুই পক্ষের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য
বৈঠকের এজেন্ডায় প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ও সবুজ জ্বালানিও রয়েছে। ডিডি নিউজের সাম্প্রতিক কলে ও প্রেস রিলিজে দেখা যায়, মোদি ও মেলোনি আগেও দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিভিন্ন ক্ষেত্র পর্যালোচনা করেছেন, যার মধ্যে বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, স্পেস, শিক্ষা এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা রয়েছে । এই ধারাবাহিকতা বোঝায় যে রোম বৈঠকটি হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো রাজনৈতিক ছবি নয়, বরং একাধিক স্তরের কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। মেলোনি ইতিমধ্যেই ভারতের সঙ্গে একটি পারস্পরিক লাভজনক ইইউ-ভারত চুক্তি চূড়ান্ত করার পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছেন বলে পিএমও-র তথ্য ও সরকারি বিবৃতিতে উল্লেখ আছে । সেই কারণে ভারতের জন্য ইতালির সমর্থন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই মূল্যবান।
আসাম ও লালা টাউনের সঙ্গে যোগসূত্র
প্রশ্ন উঠতে পারে, রোমে মোদি-মেলোনি বৈঠকের সঙ্গে লালা টাউন বা হাইলাকান্দির কী সম্পর্ক? সরাসরি নয়, কিন্তু পরোক্ষ প্রভাব আছে। যদি IMEC-ভিত্তিক বাণিজ্য ও ইউরোপমুখী লজিস্টিকস শক্তিশালী হয়, তাহলে ভারতের রপ্তানি-আমদানি কাঠামো আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে। এর প্রভাব সময়ের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের উদ্যোক্তা, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র উৎপাদন ও পরিষেবা খাতে পৌঁছাতে পারে।
বরাক উপত্যকার ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে উন্নত সংযোগ, দ্রুত পণ্য পরিবহন এবং নতুন বাজারের সুযোগের কথা বলে আসছেন। এমন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ যদি অবকাঠামো ও নীতিগত বিনিয়োগে রূপ নেয়, তাহলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য নতুন দরজা খুলতে পারে। বিশেষ করে লালা ও হাইলাকান্দির মতো এলাকায়, যেখানে কৃষি, ছোট বাণিজ্য ও আন্তঃজেলা সরবরাহব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ, সাপ্লাই চেইন উন্নত হলে মধ্যমেয়াদে উপকার মিলতে পারে।
সামনে কী দেখার
এখন নজর থাকবে রোম বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণায় কী কী অগ্রাধিকার উঠে আসে তার দিকে। IMEC-এ বাস্তব অগ্রগতি, বাণিজ্যিক বাধা কমানো, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এবং ২০২৫-২৯ যৌথ কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন—এসবই এখন প্রধান সূচক।
মোদি ও মেলোনির এই আলোচনা যদি শুধু ছবি-নির্ভর কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পদক্ষেপে এগোয়, তাহলে ভারত-ইতালি সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। আর সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি দেশের ভেতরের অঞ্চলভিত্তিক অর্থনীতিতেও ধীরে ধীরে অনুভূত হতে পারে।