গুয়াহাটির গহনা বিক্রিতে ধস নেমেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সোনা কেনা কমানোর আহ্বানের পর। শহরের অনেক জুয়েলারি দোকানে বিক্রি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, আর এর প্রভাব পড়েছে বিবাহ-নির্ভর কেনাকাটা ও উৎসবমুখী বাজারে। ১৯ মে প্রকাশিত এই খবরের মূল বার্তা হলো—জাতীয় স্তরে সোনা কেনা ও জ্বালানি খরচ কমানোর আবেদন এখন সরাসরি খুচরো বাজারকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
গহনা বিক্রিতে ধস কেন
প্রধানমন্ত্রী মোদি সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে নাগরিকদের সোনা কেনা এক বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে বিদেশি মুদ্রার চাপ কমে এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে। নিউজ অন এয়ারের সরকারি সম্প্রচারে বলা হয়, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা, অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি-নির্ভরতার কারণে এই অনুরোধ এসেছে । এনকেটিভি-র ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত সোনার অন্যতম বড় আমদানিকারক, এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ওঠানামার প্রভাব সরাসরি দেশীয় চাহিদায় পড়ে ।
গুয়াহাটিতে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিয়ে ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য যারা আগে অগ্রিম বুকিং করতেন, তারাও এখন অপেক্ষা করছেন। বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় অনেক দোকানদার দাম নিয়ে আলোচনা করলেও চূড়ান্ত বিক্রি পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে এটি শুধু একটি সাময়িক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নয়; বড় শহরগুলোর সোনার বাজারে এমন ধাক্কা সরবরাহ চেইন, স্টক ম্যানেজমেন্ট এবং কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সোনা কেনার অভ্যাসে বদল
ভারতে সোনা শুধু অলঙ্কার নয়, সঞ্চয় ও নিরাপত্তার প্রতীকও। তাই প্রধানমন্ত্রী মোদির আহ্বান বাজারে যে দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে, তা অর্থনীতির পাশাপাশি সংস্কৃতির সঙ্গেও জড়িত। নকটিভি-র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশে সোনার অধিকাংশ চাহিদা আমদানিনির্ভর, আর বছরে বিপুল পরিমাণে সোনা আমদানি হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয় । একই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সোনা আমদানি ৩০–৫০ শতাংশ কমলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় উল্লেখযোগ্য হতে পারে ।
এই প্রেক্ষাপটে গুয়াহাটির বাজারে যে “ধস” দেখা যাচ্ছে, সেটি কেবল কেনাকাটার হ্রাস নয়; বরং ভোক্তার আচরণ বদলের ইঙ্গিতও। অনেকে এখন গহনা কেনার বদলে পরে সময় দেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ সোনার বদলে কম দামের বিকল্পে ঝুঁকছেন। শহরের জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিয়ের মৌসুমের আগে এমন পতন তাদের নগদ প্রবাহে চাপ তৈরি করছে।
আসাম ও বরাকের বাজারে প্রভাব
গুয়াহাটিতে শুরু হওয়া এই প্রবণতার প্রভাব আসামের অন্যান্য জেলাতেও পড়তে পারে। হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ, কাছাড় এবং লালা টাউনের মতো এলাকায় গহনা কেনার সঙ্গে বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং পারিবারিক সঞ্চয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে গুয়াহাটির বাজারে বিক্রি কমলে, সেই খবর দ্রুত জেলার ছোট জুয়েলারি দোকান ও পাইকারি ব্যবসার মানসিকতায় পৌঁছে যায়।
বরাক উপত্যকার ছোট শহরগুলোতে ক্রেতারা সাধারণত দাম বাড়লে কেনাকাটা পিছিয়ে দেন। সোনার ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট, কারণ এটি এককালীন বড় খরচ। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বড় শহরের বাজারে মূল্য ও চাহিদা বদলালে সরবরাহকারীরাও তাঁদের ইনভেন্টরি ও ডিসকাউন্ট নীতি নতুন করে সাজান। একই সঙ্গে, পরিবারগুলো এখন সোনা কেনার বদলে অন্য বিনিয়োগ বা দৈনন্দিন খরচে টাকা রাখার কথা ভাবছে।
বাজারে অনিশ্চয়তা ও সামনে কী
জাতীয় পর্যায়ে সোনার চাহিদা কমার এই ইঙ্গিত বাজার বিশ্লেষকদের কাছেও মনোযোগের বিষয়। কারণ, সোনা যদি দ্রুত কেনা কমে, তাহলে রিটেইল জুয়েলারি চেইন, ছোট দোকান, এমনকি সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের আয়েও চাপ পড়তে পারে। অন্যদিকে, সরকার যদি জ্বালানি ও আমদানির চাপ কমাতে আরও কড়া নীতি নেয়, তাহলে এ ধরনের ভোক্তা-আচরণ দীর্ঘায়িত হতে পারে।
গুয়াহাটির জুয়েলারি বাজারে এখন মূল প্রশ্ন—এই ধস কি সাময়িক, নাকি এটি নতুন কেনাকাটার অভ্যাসের শুরু? বিয়ের মৌসুম, আন্তর্জাতিক বাজার, এবং আমদানি-ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত এই প্রবণতা আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও স্পষ্ট হবে। ততদিন পর্যন্ত গহনা বিক্রিতে ধস শুধু গুয়াহাটির নয়, আসামের পুরো খুচরো বাজারের জন্যই নজর রাখার মতো ঘটনা।