ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং টোবগের সাম্প্রতিক আসাম সফরকে ‘মাল্টিফ্যাসেটেড পার্টনারশিপ’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলে বর্ণনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। ২৫ মে গৌহাটিতে টোবগে আসাম রাজ্যপাল লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য ও মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সঙ্গে বৈঠক করেন। ভারত-ভুটান সম্পর্কের এই বৈঠকে বাণিজ্য, যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য পারস্পরিক উন্নয়নের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয় বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
অসম-ভুটান সম্পর্ক বহু দশকের কূটনৈতিক এবং পারিবারিক পর্যায়ের সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই সফরকে ঘিরে রাজ্য প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, আসাম ভবিষ্যতে ভারত-ভুটান সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, “আমরা ভুটানের সঙ্গে আমাদের বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বকে অত্যন্ত মূল্য দিই, এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দিশানির্দেশে এই বন্ধন আগামী দিনে আরও শক্তিশালী হবে।” এই মন্তব্যে শুধু সৌজন্য নয়, আঞ্চলিক সংযোগ আরও এগিয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক ইচ্ছাও প্রতিফলিত হয়েছে।
গৌহাটিতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী টোবগে গৌহাটিতে আসার পর প্রথমে রাজভবনে রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে মুখ্যমন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। ভারত টুডে নর্থইস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় বৃহত্তর উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সঙ্গে ভুটানের সম্পর্ক, সীমান্ত সংযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিক সমন্বয় গুরুত্ব পেয়েছে। শিলং টাইমসও জানায়, এ সফরে দুই পক্ষই আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সংযোগ প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিতে এই বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারত-ভুটান সম্পর্ক শুধু কেন্দ্রের স্তরে সীমাবদ্ধ নয়; উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলির সঙ্গে এর বাস্তব যোগাযোগও গভীর। ভুটান ভূখণ্ডবেষ্টিত দেশ হওয়ায় ভারতীয় ট্রানজিট ও সীমান্ত অবকাঠামো তার অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য আসামকে ঘিরে ট্রেড করিডর, সড়ক, কাস্টমস পয়েন্ট এবং পর্যটন সংযোগ এই সম্পর্কের কেন্দ্রে আসে। সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে ভুটানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহু বছর ধরে শক্তিশালী, এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ সম্পর্ক আরও প্রসারিত হয়েছে।
অসম-ভুটান সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সুযোগ
আসামের ভৌগোলিক অবস্থান ভুটানের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষ যোগাযোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। সেক্টরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাণিজ্য, জ্বালানি, কৃষিপণ্য, সড়ক-যোগাযোগ এবং সীমান্ত লজিস্টিকস—এই পাঁচটি ক্ষেত্র অসম-ভুটান সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে পারে। গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত Joint Group of Customs বৈঠকে দুই দেশ সীমান্ত বাণিজ্যকে আরও সহজ ও ডিজিটাল করার ওপর জোর দিয়েছিল বলে SASEC-এর এক নথিতে উল্লেখ আছে। এতে স্পষ্ট যে, বর্তমান সফর কোনো একক কূটনৈতিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারারই অংশ।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা অতীতে বারবার বলেছেন যে আসাম একটি “growth hub” হিসেবে কাজ করতে পারে। ভুটান সফরের অভিজ্ঞতা আসামের জন্য বহু-খাতের সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করছে, বিশেষ করে trade ও energy-এর ক্ষেত্রে। এই প্রেক্ষাপটে টোবগের সাম্প্রতিক সফর মুখ্যমন্ত্রীর সেই বৃহত্তর কৌশলেরই ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ, কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং বাস্তব অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ-ভিত্তিক সহযোগিতা গড়ে তোলাই লক্ষ্য।
বারাক উপত্যকার জন্য পরোক্ষ লাভ
এ সফরের প্রভাব সরাসরি গৌহাটি বা সীমান্তবর্তী জেলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। বারাক উপত্যকা, বিশেষ করে হাইলাকান্দি, কাছাড় ও করিমগঞ্জের মতো জেলাগুলিও আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সংযোগ-উন্নয়নের পরোক্ষ সুবিধা পেতে পারে। লালা টাউনসহ দক্ষিণ আসামের ব্যবসায়ী, পরিবহন খাত এবং পর্যটন-নির্ভর ছোট উদ্যোগগুলির কাছে উন্নত সড়ক, নিরাপদ করিডর ও সীমান্ত বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
একজন স্থানীয় শিক্ষা-গবেষক মন্তব্য করেন, “ভুটান-আসাম সম্পর্ক আরও মজবুত হলে উত্তর-পূর্বের ছোট শহরগুলিও আঞ্চলিক অর্থনীতির নতুন স্রোতে যুক্ত হতে পারে।” এই বক্তব্যের মধ্যে লালা ও হাইলাকান্দির মতো শহরগুলির জন্য বাস্তব প্রত্যাশা লুকিয়ে আছে। কারণ, যোগাযোগ যত বাড়ে, ততই বাজার, শিক্ষা ও পর্যটনের সুযোগও প্রসারিত হয়।
কূটনৈতিক বার্তার পরের ধাপ
এই সফর এখন একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে—আসাম ভবিষ্যতে ভারত-ভুটান সম্পর্কের একটি সক্রিয় অংশীদার হিসেবে সামনে আসতে চায়। টোবগের সঙ্গে বৈঠকের পর হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সামাজিক মাধ্যমে তাঁর কৃতজ্ঞতা জানান এবং বলেন, এই আলোচনা দুই পক্ষের বন্ধন আরও মজবুত করবে। টোবগের সফর শেষ হলেও এর পরের ধাপ হবে নীতিগত সিদ্ধান্ত, সীমান্ত-সমন্বয় এবং বাস্তব প্রকল্পে সেগুলি প্রতিফলিত করা।
সব মিলিয়ে, অসম-ভুটান সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক উষ্ণতার নাম নয়; এটি উত্তর-পূর্বের বিকাশ, সীমান্ত অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতারও এক গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আসাম সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে লাভ হবে গৌহাটি থেকে শুরু করে লালা টাউন পর্যন্ত।