Read today's news --> ⚡️Click here 

আসাম ইউসিসি বিল সমালোচনায় ওয়াইসি, আদিবাসী ছাড়কে বৈষম্যমূলক বললেন

আসাম ইউসিসি বিল বিধানসভায় পেশ হওয়ার পরই দেশজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়ে ওঠে। AIMIM-এর প্রধান ও হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এই বিলের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, এই আইনটি প্রকৃতপক্ষে “অভিন্ন” নয়। সামাজিক মাধ্যম X-এ এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, বিলটি তফসিলি উপজাতি বা Scheduled Tribe (ST) সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ ছাড় দিচ্ছে, অথচ মুসলিম সম্প্রদায়সহ অন্যদের ওপর এটি পুরোপুরি প্রযোজ্য হচ্ছে। ইন্ডিয়া টুডে নর্থইস্ট ও মানিকন্ট্রোলের একাধিক প্রতিবেদনে এই অভিযোগ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

ওয়াইসির সাংবিধানিক প্রশ্ন আদিবাসী ছাড়ের বিতর্ক

আসাম ইউসিসি বিল সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মূল প্রশ্ন—বিলটি যদি ‘অভিন্ন’ দেওয়ানি বিধি হয়, তবে কেন কিছু সম্প্রদায় এর বাইরে থাকবে? ওয়াইসি X-এ লেখেন, “আসাম ইউনিফর্ম সিভিল কোড মোটেও অভিন্ন নয়। এটি আদিবাসী সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণভাবে এর আওতার বাইরে রাখছে। সংবিধানের ৩৯নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার অধিকার আছে, তাহলে শুধু আদিবাসীদের স্বায়ত্তশাসনকে কেন সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে? এটি একটি আইন চাপিয়ে দেওয়া, যা কেউ চায়নি। সংবিধান পরিষদ কখনো বাধ্যতামূলক UCC-এর কথা ভাবেনি।” এই বক্তব্যে তিনি সাংবিধানিক ২৯নং অনুচ্ছেদের কথাও টেনে আনেন, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার অধিকার দেয়।

ওয়াইসি এই বিলকে “হিন্দু আইন মুসলমানদের ওপর পিছনের দরজা দিয়ে চাপানোর” প্রচেষ্টা বলেও অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, উত্তরাধিকার, বিবাহ এবং তালাকের ক্ষেত্রে হিন্দু মতবাদ প্রযোজ্য করা হচ্ছে, অথচ শুধু মুসলমানদেরই এই “অভিন্ন” নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে। এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়; এটি একটি গভীর সাংবিধানিক বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে “সমতা” ও “বৈচিত্র্য” এই দুটি মূল্যবোধের মধ্যে সংঘাত দেখা যাচ্ছে।

বিলের আদিবাসী ছাড়ের সরকারী যুক্তি

সরকারের পক্ষ থেকে আদিবাসী ছাড়ের ব্যাপারে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, “আমরা আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ইউসিসি-র আওতার বাইরে রেখেছি। তাদের সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান, ঐতিহ্য এবং প্রথা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে।” সরকার যুক্তি দেয়, আসামের বৈচিত্র্যময় জাতিগত ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এই ছাড় দেওয়া হয়েছে। সংসা লিগ্যালের এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে পাহাড়ি ও সমতল উভয় অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়কে এই ছাড়ের আওতায় আনা হয়েছে, কারণ তাদের নিজস্ব প্রথাগত আইনব্যবস্থা বহু শতাব্দীর পুরনো।

তবে এই যুক্তির বিপরীতে ওয়াইসির প্রশ্ন হলো, যদি আদিবাসীদের সংস্কৃতি রক্ষার অধিকার থাকে, তবে মুসলমান, খ্রিস্টান বা অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলির নিজস্ব ব্যক্তিগত আইনকে কেন সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে না? এই বিষয়টিকে “লিঙ্গ ন্যায় থেকে অনেক দূরে” বলে মন্তব্য করা হয়েছে। এই দুই পক্ষের বিতর্ক স্পষ্ট করে দিচ্ছে, আসামে এই বিলকে ঘিরে আইনি নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যটাই মূল সংঘাতের জায়গা।

বারাক উপত্যকা লালা টাউনে এই বিতর্কের প্রতিধ্বনি

আসাম ইউসিসি বিল সমালোচনা শুধু দিল্লি বা গৌহাটির রাজনীতির বিষয় নয়—এর প্রভাব বারাক উপত্যকার হাইলাকান্দি, লালা টাউন, করিমগঞ্জ ও কাছাড় জেলার মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে সরাসরি অনুভূত হয়। এই অঞ্চলে মুসলমান সম্প্রদায়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য, এবং ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তন তাদের বিবাহ, তালাক ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

লালা টাউনের একজন সমাজসেবী বলেন, “এই বিলের প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের মাটির মানুষের কথা শুনতে হবে। এখানে অনেক পরিবার আছে যারা ধর্মীয় আচার অনুযায়ী বিবাহ করে, কিন্তু কখনো আইনগতভাবে নিবন্ধন করেননি। নতুন আইনে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন হলে অনেকের কাছে তা বাস্তবিক সমস্যা তৈরি করবে।” তাঁর মতে, এই নিয়মগুলি কার্যকর হওয়ার আগে গ্রামীণ পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার দরকার। ওয়াইসির আপত্তি তাই কেবল সংসদীয় রাজনীতির অংশ নয়—বারাক উপত্যকার কমিউনিটিগুলির কাছেও এটি একটি জীবন্ত প্রশ্ন।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বিল পাসের পরবর্তী পথ

ওয়াইসি ছাড়াও কংগ্রেস ও রাইজোর দলসহ একাধিক বিরোধী দল আসামের এই বিলের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। আসাম এই বিল উপস্থাপন করে উত্তরাখণ্ড ও গোয়ার পর তৃতীয় রাজ্য হিসেবে ইউসিসি-র পথে এগিয়ে গেছে। তবে বিধানসভায় বিলটি পাস হওয়ার আগে আরও আলোচনা ও ভোটের প্রক্রিয়া বাকি।

ডেভডিসকোর্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিল ঘিরে আসামে একটি “সংস্কৃতির সংঘাত” তৈরি হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় আইনের অভিন্নতা ও সামাজিক বৈচিত্র্যের মধ্যে কোনটি অগ্রাধিকার পাবে, সেটাই মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিতর্ক কেবল আইনগত নয়, এটি আসামের বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় পরিচয়কেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিধানসভায় বিলটির পরিণতি কী হবে—সেটাই এখন সবার নজরে।

আসাম ইউসিসি বিল সমালোচনায় ওয়াইসি, আদিবাসী ছাড়কে বৈষম্যমূলক বললেন
Scroll to top