
মঙ্গলবার গুয়াহাটিতে যখন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বিজেপির মেগা নির্বাচনী ইশতেহার বা ‘সংকল্প পত্র’ প্রকাশ করছেন, ঠিক তখনই শহরের বুকে গুয়াহাটি সেন্ট্রাল (Guwahati Central) কেন্দ্রটি এক ভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণের সাক্ষী হচ্ছে। আগামী ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হতে চলা অসম বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রেই বিজেপির এক পোড়খাওয়া নেতার বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে নেমেছেন অসম জাতীয় পরিষদ (AJP)-এর ২৬ বছর বয়সী তরুণী কুঙ্কি চৌধুরী।
বিজেপির প্রকাশিত ওই ইশতেহারে ইউসিসি (UCC), লাভ জিহাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, ২ লক্ষ চাকরি এবং রাজ্যের দীর্ঘদিনের বন্যা সমস্যা মোকাবিলায় ১৮,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের মতো চমকপ্রদ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে । তবে রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে গুয়াহাটি সেন্ট্রালের এই অসমবয়সী লড়াই, যাকে রাজ্যের ৭২.৮৩ লক্ষ যুব ভোটারের মানসিকতার এক লিটমাস টেস্ট হিসেবে দেখা হচ্ছে । ১.৯১ লক্ষের বেশি ভোটার অধ্যুষিত এই কেন্দ্রে দুই প্রার্থীর প্রচারের ধরনও সম্পূর্ণ আলাদা ।
বিজেপির বর্ষীয়ান প্রার্থী বিজয় কুমার গুপ্ত যখন মালিগাঁওয়ের কর্দমাক্ত ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে তাঁর পুরনো পরিচিতি ও সুনামের ওপর ভরসা করে প্রচার চালাচ্ছেন, তখন নবাগতা কুঙ্কি পানবাজার সহ শহরের অলিগলিতে গিয়ে ভোটারদের ঘরে ঘরে পৌঁছাচ্ছেন । তরুণ এই প্রার্থীর প্রচারের মূল ফোকাস একেবারেই স্থানীয় নাগরিক সমস্যা—নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানীয় জলের পাইপলাইনের সমস্যা সমাধান, পার্কিং সংকট মেটানো এবং দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলা । অন্যদিকে, নিজের তরুণ প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিয়ে একেবারেই চিন্তিত নন বিজয় কুমার গুপ্ত। সাংবাদিকদের তিনি স্পষ্ট জানান যে, আদর্শ, সংস্কৃতি এবং জাতীয় স্তরে দলের ভাবমূর্তির কারণে যুবসমাজ বিজেপির দিকেই ঝুঁকে রয়েছে, তাই এই নির্বাচনে তাঁর সামনে কোনো বড় চ্যালেঞ্জ নেই ।
তবে পিটিআই (PTI)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কুঙ্কি চৌধুরী দাবি করেন, প্রথম দিন থেকেই তিনি সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন এবং ভোটাররা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছেন । তাঁর মতে, বিপুল সংখ্যার নিরিখে এবারের নির্বাচনে ‘জেনারেশন জেড’ বা নতুন প্রজন্মের ভোটাররাই রাজ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নির্ণায়ক শক্তি হতে চলেছে । নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যানও তরুণ প্রার্থীর এই দাবিকে সমর্থন করছে। ২০২১ সালের ৬৯.৩৫ লক্ষের তুলনায় এবার অসমে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২.৮৩ লক্ষে। এর মধ্যে ৬.২৮ লক্ষ ভোটারের বয়স ১৮-১৯ বছরের মধ্যে এবং বাকি ৬৬.৫৫ লক্ষ ভোটারের বয়স ২০ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে ।
পিটিআই-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গুয়াহাটি সেন্ট্রালের প্রথমবার ভোট দিতে চলা তরুণ-তরুণী এবং পড়ুয়াদের মধ্যে অবশ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একাংশ সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার কথা স্বীকার করে সেগুলি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং কর্মসংস্থানের দাবি তুলেছেন । অনেকেই আবার দীর্ঘমেয়াদী অর্থনীতির স্বার্থে ‘খয়রাতি’ বা বিনামূল্যে সুবিধা দেওয়ার রাজনীতির সমালোচনা করেছেন। তাঁদের দাবি, কর্মসংস্কৃতির ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি কলেজের পরিকাঠামো উন্নয়ন, ফি কমানো এবং শিক্ষা সামগ্রীর দাম কমানোর দিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত । যদিও বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার ‘নিযুত ময়না’ ও ‘নিযুত বাবু’ প্রকল্পের কথা তুলে ধরে দাবি করেছে যে তারা ইতিমধ্যেই ১.৬৫ লক্ষ সরকারি চাকরি দিয়েছে । আগামী ৪ মে রাজ্যের ১২৬টি বিধানসভা আসনের ভোটগণনার দিনই স্পষ্ট হবে যুবসমাজের এই চাওয়া-পাওয়া ব্যালট বাক্সে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলল ।