
৯ এপ্রিলের আসাম বিধানসভা নির্বাচনের আগে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক লড়াই এখন ব্যক্তিগত সততা প্রমাণের স্তরে পৌঁছে গেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা (Himanta Biswa Sarma) এবং আসাম প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গোগোইয়ের (Gaurav Gogoi) মধ্যে চলমান সম্পত্তি ও পাসপোর্ট বিতর্ক এবার নতুন মোড় নিয়েছে। হিমন্ত গৌরব গোগোই শপথ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে একে অপরকে পবিত্র ধর্মীয় স্থানে গিয়ে নিজেদের দাবির সত্যতা প্রমাণের আহ্বান জানিয়েছেন। India Today NE-এর একটি ভিডিও রিপোর্ট অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা গোগোইকে পবিত্র বটদ্রবা থানে (Batadrava Than) গিয়ে শপথ নেওয়ার এই অভিনব চ্যালেঞ্জটি জানিয়েছেন।
এই শপথ-যুদ্ধ শুরু হয়েছে মূলত মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী রিনিকি ভূয়াঁ শর্মার (Riniki Bhuyan Sharma) বিরুদ্ধে ওঠা বিদেশি পাসপোর্ট এবং বিদেশে সম্পত্তির অভিযোগকে কেন্দ্র করে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে এই কাদা-ছোঁড়াছুড়ি ততই তীব্র আকার ধারণ করছে, যা বরাক উপত্যকা থেকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা পর্যন্ত সর্বত্র আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পবিত্র বটদ্রবা থান ও ভগবদ গীতা: রাজনীতির নতুন ময়দান
বটদ্রবা থান আসাম নির্বাচন প্রচারে এবার একটি প্রতীকী রূপ ধারণ করেছে। এর আগে সোমবার রাহা (Raha)-তে একটি নির্বাচনী প্রচার সভা শেষে গৌরব গোগোই প্রথমে মুখ্যমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিলেন। Deccan Herald-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গোগোই বলেন, “আমি ভগবদ গীতায় (Bhagavad Gita) হাত রেখে শপথ করে বলতে পারি যে লন্ডনে আমার কোনো সম্পত্তি নেই, যেমনটা শর্মা অভিযোগ করেছেন। তিনি কি সেটা করতে পারবেন? আমি তাঁকে একটি সাধারণ জায়গায় এসে ভগবদ গীতায় হাত রেখে শপথ নেওয়ার চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি।”
গোগোইয়ের এই চ্যালেঞ্জের জবাবেই মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। তিনি গোগোইকে আসামের পবিত্র স্থান বটদ্রবা থানে গিয়ে শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান। শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের (Srimanta Sankardeva) জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত এই বটদ্রবা থান আসামের মানুষের কাছে অত্যন্ত আবেগের জায়গা। রাজনীতির ময়দানে নিজেদের সততা প্রমাণের জন্য ধর্মীয় স্থান ও ধর্মগ্রন্থকে টেনে আনার এই প্রবণতা আসামের নির্বাচনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
রিনিকি শর্মার পাসপোর্ট বিতর্ক এবং পাকিস্তানি লিঙ্কের অভিযোগ
রিনিকি শর্মা পাসপোর্ট বিতর্ক এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে কংগ্রেস নেতারা, বিশেষ করে গৌরব গোগোই এবং পবন খেরা, অভিযোগ করে আসছেন যে মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রীর কাছে তিনটি দেশের (মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা) পাসপোর্ট রয়েছে এবং দুবাইতে তাঁর নামে গোল্ডেন ভিসা ও সম্পত্তি আছে।
India TV এবং Deccan Herald-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এই সমস্ত অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, কংগ্রেস একটি “পাকিস্তানি সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ” থেকে পাওয়া মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযোগগুলো সাজিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন যে, যদি বিদেশে তাঁদের কোনো সম্পত্তি থাকত এবং তা নির্বাচনী হলফনামায় ঘোষণা করা না হতো, তবে তা তাঁর প্রার্থিতা বাতিলের কারণ হতে পারত। তাই এই অভিযোগগুলোর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। ইতিমধ্যে মিশরীয় দূতাবাসও রিনিকি শর্মার নামে থাকা পাসপোর্টটিকে জাল বলে নিশ্চিত করেছে।
হাইলাকান্দি ও লালায় শপথ-চ্যালেঞ্জের প্রভাব
আসাম CM হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং গৌরব গোগোইয়ের মধ্যে এই হিমন্ত গৌরব গোগোই শপথ চ্যালেঞ্জ হাইলাকান্দি জেলা এবং লালা টাউনের ভোটারদের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি করেছে। বরাক উপত্যকায় যেখানে মূল নির্বাচনী ইস্যু হওয়া উচিত ছিল কর্মসংস্থান, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং রাস্তার উন্নয়ন, সেখানে জাতীয় স্তরের নেতাদের এই ব্যক্তিগত স্তরের লড়াই স্থানীয় বিষয়গুলোকে কিছুটা হলেও আড়ালে ঠেলে দিচ্ছে। লালা বাজারের চায়ের দোকানগুলোতে এখন আলোচনা চলছে, আসলেই কি কোনো নেতা বটদ্রবা থানে গিয়ে শপথ নেবেন, নাকি এটি নিছকই নির্বাচনের আগে ভোটারদের আবেগ নিয়ে খেলার একটি কৌশল মাত্র।
৯ এপ্রিল আসামের ১২৬টি আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ হবে। প্রচারের শেষ দিনে এই ‘শপথ-যুদ্ধ’ রাজনৈতিক উত্তাপকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে। তবে ভোটাররা শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় শপথের এই আবেগপ্রবণ রাজনীতিতে প্রভাবিত হবেন, নাকি বাস্তব উন্নয়নের নিরিখে ভোট দেবেন—তার উত্তর মিলবে ৪ মে, গণনার দিন।