হিমন্ত মমতাকে মাছ খাওয়া প্রতিযোগিতার আহ্বান জানালেন — পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে এক নতুন মাত্রা যোগ হল। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা শুক্রবার সামাজিক মাধ্যম পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন — তাঁর একজন প্রতিনিধিকে পাঠান একটি মাছ খাওয়া প্রতিযোগিতায়, দেখা যাক আসামের BJP না TMC — কে বেশি মাছ খেতে পারে। এই তির্যক মন্তব্যের সূত্রপাত তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) সেই অভিযোগ থেকে, যেখানে দলটি দাবি করে আসছে যে বাংলায় BJP ক্ষমতায় এলে মাছ ও মাংস খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ২৯৪ আসনের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ, আর গণনা ৪ মে।
‘খাদ্য রাজনীতি’: বাংলার ভোটে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ মাছ?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দানে মাছ-ভাত কেবল খাবার নয় — এটি বাঙালি পরিচয়ের প্রতীক। TMC এই অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ফেব্রুয়ারি থেকেই প্রচার শুরু করেছে যে BJP ক্ষমতায় এলে বাংলার থালা থেকে মাছ উঠে যাবে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক জনসভায় বলেছেন, “বাংলা বাঁচে মাছে-ভাতে — BJP এলে সব শেষ।” এই অভিযোগের পেছনে TMC বিহারের উদাহরণ টেনেছে — সেখানে BJP সরকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে মাংস বিক্রির দোকান নিষিদ্ধ করার কথা বলেছিল। তার জবাবে BJP-ও পাল্টা অভিযান শুরু করে — এমনকি বিধাননগরের BJP প্রার্থী ডা. শারদ্বৎ মুখোপাধ্যায় প্রচারে বেরিয়েছেন হাতে বিশাল কাতলা মাছ নিয়ে, বলেছেন: “আমরা মাছ খাব, মাংস খাব — আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চলছে’’l
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও এই বিতর্কে মুখ খুলেছেন। ৯ এপ্রিল BJP-র পশ্চিমবঙ্গ ইশতেহার প্রকাশের দিনই তিনি স্পষ্ট করেছেন: “মাছ ও ডিম বন্ধ হবে না।” BJP-র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি শামিক ভট্টাচার্যও বলেছেন, “বাংলার মানুষ মাছ ছাড়া থাকতে পারে না — বাংলায় মাছ-মাংস থাকবেই।“
হিমন্তের বাংলা অভিযান: মাছ থেকে গরু পাচার পর্যন্ত
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবার নিজে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। Times of India-র খবর অনুযায়ী, তিনি ৫০ সদস্যের একটি আসাম ব্রিগেড নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রচার করতে গেছেন। উত্তরবঙ্গে একটি নির্বাচনী সভায় তিনি সরাসরি মাছ-রাজনীতিকে সামনে আনেন। তিনি বলেন: “ধুবড়ি বা গোয়ালপাড়া যান — মাছ-মাংস যত খুশি খান, কোনো বাধা নেই।” তবে গরুর মাংস প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট: “আমরা সনাতনী। গরুর মাংস আমরা খাব না, কাউকে খেতেও দেব না।”
এদিকে, হিমন্ত বিশ্ব শর্মা TMC সরকারের বিরুদ্ধে গরু পাচারের গুরুতর অভিযোগও এনেছেন। তিনি দাবি করেছেন, TMC বাংলাদেশে বেআইনি গরু পাচার বন্ধ হোক সেটা চায় না কারণ এই পাচার থেকে দলীয় আয় আসে। তিনি আরও বলেছেন, বাংলায় যেখানে মানুষ বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢুকছে, সেখানে গরু যাচ্ছে ভারত থেকে বাংলাদেশে — এই সরকার অবৈধ অনুপ্রবেশ সামলাতে অক্ষম।
পশ্চিমবঙ্গের চা বাগান শ্রমিকদের প্রসঙ্গেও কথা বলেছেন হিমন্ত। আসামে চা বাগান শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ২৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৮০ টাকা ও রেশন দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। বাংলার চা শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন: “মামতাজি, মজুরি বাড়ান — তাহলে শ্রমিকরাও মাছ-মাংস খেতে পারবেন।”
বরাক উপত্যকার বাঙালি ভোটারদের কাছে এই বিতর্কের প্রতিধ্বনি
লালা ও হাইলাকান্দি এলাকার বাঙালি পরিবারগুলোর কাছে এই হিমন্ত মমতা মাছ খাওয়া প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ নিছক ঠাট্টার বিষয় নয় — এর পেছনে রয়েছে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বার্তা। বরাক উপত্যকার বাঙালি-অধ্যুষিত এই অঞ্চলেও মাছ-ভাত দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে ‘খাদ্য রাজনীতি’ যখন মাথাচাড়া দিয়েছে, তখন এখানকার বাসিন্দারাও মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন — আসামের BJP সরকার সত্যিই তাদের খাদ্যাভ্যাসে কোনো হস্তক্ষেপ করেছে কিনা। হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দাবি — করেনি। আর সেটাই তাঁর প্রচারের মূল ভিত্তি।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২৩ ও ২৯ এপ্রিল শেষ হওয়ার পর ৪ মে ফলাফল বের হবে। এই নির্বাচনে ‘খাদ্য রাজনীতি’ কতটা প্রভাব ফেলবে তা বলা কঠিন, তবে মাছ যে এবারের ভোটে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে — তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। হিমন্তের মাছ খাওয়া প্রতিযোগিতার আহ্বান TMC গ্রহণ করে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।