
৯ এপ্রিল ২০২৬ — আসামের এক কোটি পঁচিশ লক্ষেরও বেশি ভোটার যেদিন ব্যালটের সামনে দাঁড়াবেন, সেদিনটি তৈরি হয়েছে মাসের পর মাসের নিরলস পরিকল্পনায়। আসাম ভোটের দিন নির্বাচনী প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে এবার রাজ্যজুড়ে মোট ১,৫১,১৩২ জন পোলিং কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। Assam Tribune-এ প্রকাশিত সাংবাদিক অনন্যা ভট্টাচার্যের (Ananya Bhattacharjee) বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন ভোটার যখন EVM-এর বোতাম টেপেন, তার অনেক আগেই শত শত কর্মীর শ্রম, সমন্বয় ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির এক বিশাল শৃঙ্খল সম্পন্ন হয়ে যায়। রাজ্যের ৩১,৪৯০টি ভোটকেন্দ্রের প্রতিটিতে এবার লাইভ ওয়েবকাস্টিং (webcasting) চালু থাকবে — যা আসামের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এই বছর নির্বাচনটি শুধু দেশের ভেতরে নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও মনোযোগ পেয়েছে।
ভোটার যেটুকু দেখেন — সারিতে দাঁড়ানো, বুথে ঢোকা, বোতাম টেপা — তার পেছনে থাকে এক বিশাল নীরব যন্ত্রের অবিরাম কাজ। সেই যন্ত্রের মানবিক মুখ এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নিয়েই এই প্রতিবেদন।
EVM, VVPAT ও ওয়েবকাস্টিং: প্রযুক্তিতে স্বচ্ছতার নতুন মাত্রা
EVM VVPAT ওয়েবকাস্টিং আসাম নির্বাচনে এবার কতটা বড় ভূমিকা রাখছে তা সংখ্যায় বোঝা যায়। Assam Tribune-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যজুড়ে মোট ৪১,৩২০টি ব্যালট ইউনিট (Ballot Unit), ৪৩,৯৭৫টি কন্ট্রোল ইউনিট (Control Unit) এবং ৪৩,৯৯৭টি VVPAT মেশিন প্রস্তুত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতির জন্য যথেষ্ট পরিমাণে রিজার্ভ সরঞ্জামও মজুত রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো, রাজ্যের সবকটি ৩১,৪৮৬টি মূল বুথ এবং ৪টি সহায়ক বুথ — মোট ৩১,৪৯০টি কেন্দ্রে — এবার সম্পূর্ণ ওয়েবকাস্টিং চালু থাকবে। এর অর্থ, নির্বাচন কমিশনের (ECI) কন্ট্রোল রুম থেকে কর্মকর্তারা রিয়েল-টাইমে (real-time) যেকোনো কেন্দ্রের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। ফলে অনিয়ম ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। এই স্বচ্ছতার পদক্ষেপ ভোটারদের আস্থা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন নির্বাচনী বিশেষজ্ঞরা।
নিরাপত্তার ব্যবস্থাও এবার যথেষ্ট কঠোর। কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (Central Armed Police Forces, CAPF) এবং CRPF-এর জওয়ানরা বিভিন্ন সংবেদনশীল ভোটকেন্দ্রে মোতায়েন রয়েছেন। এর পাশাপাশি মাইক্রো অবজার্ভার (micro observer) নিয়োগ করা হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়, যাঁরা মাঠ পর্যায়ে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবেন। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক (Chief Electoral Officer) অনুরাগ গোয়েল (Anurag Goel) ভোটারদের উদ্দেশে বলেছেন, “প্রতিটি ভোট জাতি গড়ার শক্তি বহন করে এবং গণতান্ত্রিক চেতনাকে জীবন্ত রাখে।” তিনি সকলকে কেবল নিজে ভোট দেওয়ার নয়, আশেপাশের মানুষকেও উৎসাহিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
আসাম নির্বাচন ২০২৬ পোলিং কর্মী: অদেখা পরিশ্রমের গল্প
আসাম নির্বাচন ২০২৬ পোলিং কর্মীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা সচরাচর মিডিয়ার আলোয় আসে না। Assam Tribune-এর প্রতিবেদনে কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, যা থেকে উঠে এসেছে নির্বাচনী যন্ত্রের মানবিক দিকটি। সেকশন অফিসার বেদান্ত দাস (Bedanta Das) জানান, “নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রাস্তার মানচিত্র তৈরি করা এবং মাঠে গিয়ে পরিস্থিতি যাচাই করার কাজ অনেক আগে থেকেই শুরু হয়। একটির পর একটি কেন্দ্রের দায়িত্ব সামলাতে হয়।” তিনি আরও জানান যে প্রাথমিকভাবে মাঠ সরেজমিন পরিদর্শনের জন্য কোনো সরকারি পরিবহন দেওয়া হয় না এবং নিজের খরচে যাতায়াত করার পরেও সেই অর্থ ফেরত পাওয়া যায় না।
পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট সেলে (personnel management cell) কর্মরত প্রাঞ্জল কলিতা (Pranjal Kalita) বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া আসলে মাসের পর মাস আগে থেকেই চলে — তথ্য সংগ্রহ থেকে কর্মী বরাদ্দ পর্যন্ত। তবে বাস্তবে সমন্বয় সব সময় সুষ্ঠু হয় না। “অনেক সময় কর্মকর্তাদের প্রশাসন অফিসে ডাকা হয়, কিন্তু সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু নির্দেশপত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।” সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই অপেক্ষার পাশাপাশি নিজের নিয়মিত অফিসের কাজও জমে যায়, ফলে পরে আরও বেশি চাপ সহ্য করতে হয়।
এই আসাম ভোটের দিন নির্বাচনী প্রস্তুতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আন্তর্জাতিক দৃষ্টি। ইন্টারন্যাশনাল ইলেকশন ভিজিটর্স প্রোগ্রামের (International Election Visitors Programme, IEVP) আওতায় সাতটি দেশের নির্বাচন পরিচালনা সংস্থার ১২ জন প্রতিনিধি এবং ECI-র তিনজন কর্মকর্তা ৮ এপ্রিল গুয়াহাটিতে পৌঁছেছেন। দুইদিনের এই সফরে তাঁরা আসামের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করবেন এবং ভারতের গণতান্ত্রিক মডেল সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা নেবেন। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নির্বাচনী কৌশল সম্পর্কে আন্তর্জাতিক আগ্রহ যে বাড়ছে, এই সফর তার স্পষ্ট প্রমাণ।
হাইলাকান্দি ও লালায় ভোটার-বান্ধব বুথ ব্যবস্থা
হাইলাকান্দি লালা ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থা নিয়ে এবার বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। Assam Tribune-এর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, রাজ্যের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে এবার খাবার পানি, বসার ব্যবস্থা, শৌচাগার এবং প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য হুইলচেয়ারের সুবিধা রাখা হয়েছে। দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষার জন্য ছায়ার ব্যবস্থা এবং মোবাইল ফোন নিরাপদে জমা রাখার পরিকাঠামোও প্রস্তুত।
হাইলাকান্দি জেলার লালা, কাটলিছড়া (Katlicherra) এবং শ্রীভূমি-সংলগ্ন এলাকাগুলোতেও একই মানদণ্ড বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বরাক উপত্যকার (Barak Valley) পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানো সহজ নয় এমন কেন্দ্রগুলোর জন্য বিশেষ লজিস্টিক পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। লালা ও হাইলাকান্দির ভোটাররা যাতে কোনো বাধা ছাড়াই তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে জেলা নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ সক্রিয় রয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্র জানাচ্ছে।
৯ এপ্রিলের আসাম ভোটের দিন নির্বাচনী প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেড় লাখেরও বেশি কর্মী, হাজার হাজার যন্ত্রপাতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সামনে আসাম এক বিশাল গণতান্ত্রিক উৎসবের দ্বারপ্রান্তে। ভোটকেন্দ্রের বাইরের প্রচারের হট্টগোল থেমে গেছে, নীরব সময় শুরু হয়েছে। এখন দেখার পালা — মানুষ কীভাবে তাঁদের রায় জানাবেন। কিন্তু সেই রায়ের পথ যাঁরা তৈরি করেছেন — বেদান্ত দাস বা প্রাঞ্জল কলিতার মতো নামহীন হাজার হাজার কর্মী — তাঁদের অবদান ইতিহাসের পাতায় না থাকলেও আসামের গণতন্ত্রের ভিত্তিতে তাঁদের পরিশ্রম চিরকাল মিশে থাকবে।