
মণিপুরে জাতিগত সংঘাত ও শান্তি উদ্যোগের মধ্যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং কুকি-অধ্যুষিত কাংপোকপি জেলার মধ্য দিয়ে সেনাপতি জেলা সফরের পরিকল্পনা করেছেন। ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে এই খবর সামনে আসার ঠিক একদিন আগে বিষ্ণুপুর জেলায় বোমা হামলায় দুটি শিশু প্রাণ হারানোর পর রাজ্যজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। একই দিনে রাজ্য সরকার পাঁচটি উপত্যকা জেলায় আংশিকভাবে ব্রডব্যান্ড সংযোগ পুনরুদ্ধার করেছে, তবে মোবাইল ডেটা পরিষেবা এখনও বন্ধ রয়েছে।
বিষ্ণুপুরে শিশু হত্যা ও নতুন অস্থিরতা
৭ এপ্রিল রাত প্রায় একটার সময় বিষ্ণুপুর জেলার মইরাং ট্রংলাওবি এলাকায় একটি বাড়িতে সন্দেহভাজন বন্দুকধারীরা মর্টার শেল নিক্ষেপ করে। হামলায় পাঁচ বছর বয়সী একটি ছেলে এবং মাত্র ছয় মাস বয়সী একটি মেয়ে শিশু ঘটনাস্থলে নিহত হয়। তাদের মা গুরুতর আহত হন। নিহত শিশুদের পিতা একজন BSF জওয়ান। মেইতেই সংগঠনগুলো এই হামলার জন্য কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দায়ী করে।
এই হত্যাকাণ্ড তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয়। বিক্ষুব্ধ জনতা জ্বালানি ট্যাংকার পুড়িয়ে দেয় এবং একটি দল CRPF ক্যাম্পে হামলা চালাতে গেলে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ও গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে কমপক্ষে ১৯ জন আহত হন এবং আরও দুটি মৃত্যুর খবর আসে। ৭ এপ্রিল মুখ্যমন্ত্রী খেমচাঁদ সিং রাজ্য সচিবালয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠক আহ্বান করেন এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেন।
ইন্টারনেট বন্ধ ও আংশিক পুনরুদ্ধার
শিশু হত্যার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মণিপুর সরকারের স্বরাষ্ট্র বিভাগ ইম্ফল পূর্ব, ইম্ফল পশ্চিম, থৌবাল, কাকচিং এবং বিষ্ণুপুর — এই পাঁচটি উপত্যকা জেলায় তিন দিনের জন্য সমস্ত মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড পরিষেবা স্থগিত করে। স্বরাষ্ট্র বিভাগের আদেশে বলা হয়, বিরাজমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে গুজব ও ভুয়া তথ্যের প্রসার ঠেকাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে ৮ এপ্রিল, বুধবার, সরকার পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর আংশিকভাবে ব্রডব্যান্ড সংযোগ পুনরুদ্ধারের সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়, ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা উচ্চ আদালতের কার্যক্রম, গুরুত্বপূর্ণ দফতর এবং ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম কাজে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল। তাই নিবন্ধিত ISP ও TSP-এর মাধ্যমে ILL এবং FTTH ব্রডব্যান্ড সংযোগ শর্তসাপেক্ষে চালু করা হয়েছে। তবে Wi-Fi বা হটস্পট শেয়ারিংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে এবং মোবাইল ডেটা পরিষেবা বন্ধ রয়েছে।
মণিপুরে জাতিগত সংঘাত ও শান্তি উদ্যোগে CM-এর সফর
এই উত্তাল পরিস্থিতিতেই মণিপুরে জাতিগত সংঘাত ও শান্তি উদ্যোগের অংশ হিসেবে CM খেমচাঁদ সিং কুকি-অধ্যুষিত কাংপোকপি জেলার মধ্য দিয়ে সেনাপতিতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী লোশি ডিখো জানিয়েছেন, নাগা পিপলস অর্গানাইজেশন, প্রধান উপজাতীয় সংগঠন, মহিলা দল এবং ছাত্র সংগঠনগুলো সেনাপতিতে মুখ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।
ডিখো বলেন, “মানুষ শান্তি চান। সমস্ত সম্প্রদায় জুড়েই সরকারের উদ্যোগের প্রতি সমর্থন রয়েছে। মাত্র কিছু বিঘ্নকারী উপাদান সমস্যা তৈরির চেষ্টা করছে।” এর আগে ৪ এপ্রিল CM খেমচাঁদ জিরিবাম জেলায় তিনদিনের সফর করেছিলেন — যা সেখানে জাতিগত অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর প্রথম সড়কপথে সফর। সেই সফরে তিনি NH-37 হয়ে ইম্ফল থেকে ২১৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছিলেন, যেটি কুকি-অধ্যুষিত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যায়। সেই যাত্রায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন আট জন BJP বিধায়ক এবং রাজ্য BJP সভাপতি এ শার্দা।
উপমুখ্যমন্ত্রী ডিখো আরও বলেন, “মণিপুরের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু শান্তি ছাড়া আমরা এগোতে পারব না। আমার আবেদন — মানুষ পরস্পরকে বুঝুন এবং একসঙ্গে কাজ করুন।”
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পটভূমি
মণিপুরে এই জাতিগত সংঘাত নতুন নয়। ২০২৩ সালের ৩ মে মেইতেই এবং কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে যে জাতিগত সহিংসতা শুরু হয়েছিল, তাতে সরকারি হিসাবেই ২৬০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৬০,০০০-এর বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ৪,৭৮৬টি বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ৩৮৬টি ধর্মীয় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিন বছরের বেশি সময় পরেও রাজ্যে স্থায়ী শান্তি ফেরেনি।
Deutsche Welle-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইম্ফলের সম্পাদক ও রাজনীতি বিশ্লেষক প্রিপ ফৌবাম বলেন, “আমাদের নির্বাচনী সহানুভূতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, যেখানে প্রতিটি পক্ষ শুধু নিজের কষ্ট অনুভব করে। সকল পক্ষকে একে অপরের যন্ত্রণা স্বীকার করতে হবে এবং সামগ্রিক নিরাময়ের পথ খুঁজতে হবে।”
আসাম ও বরাক উপত্যকার প্রেক্ষাপট
মণিপুরের পরিস্থিতি আসামের বরাক উপত্যকা এবং হাইলাকান্দির মতো সীমান্তবর্তী জেলার মানুষের কাছে কখনোই দূরের ঘটনা নয়। মণিপুরের সঙ্গে আসামের দীর্ঘ সীমানা রয়েছে এবং জিরিবাম-আসাম সড়কপথ উভয় রাজ্যের মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগের জীবনরেখা। মণিপুরে অস্থিরতা বাড়লে এই পথে পণ্য পরিবহন ও মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে বরাক উপত্যকার বাজার এবং ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর। লালা টাউনের মতো ব্যবসায়িক কেন্দ্রেও এই অস্থিরতার প্রভাব অনুভূত হয়, বিশেষত কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে।
CM খেমচাঁদ সিংয়ের এই শান্তি সফর কতটা সফল হবে তা আগামী দিনের ঘটনাপ্রবাহই বলবে। দুটি নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু রাজ্যের ক্ষত আরও গভীর করেছে এবং উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাসের দেওয়াল আরও মজবুত হয়েছে। শান্তির পথে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে — রাজনৈতিক সফরের বাইরে গিয়ে সরকার কি সত্যিকারের আস্থা পুনর্গঠনের কাজ করতে পারবে। মণিপুরের মানুষ, বাস্তুচ্যুত পরিবার এবং শিশু হারানো পিতামাতার জন্য কেবল ঘোষণা নয় — দরকার বাস্তব পদক্ষেপ।