
পবন খেরা আগাম জামিন চেয়ে ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে গুয়াহাটি হাইকোর্টে আবেদন করেছেন। কংগ্রেসের জাতীয় মিডিয়া সভাপতি পবন খেরার বিরুদ্ধে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্ত্রী রিনিকি ভূঁইয়া শর্মা গত ৬ এপ্রিল গুয়াহাটির ক্রাইম ব্রাঞ্চে একটি FIR দায়ের করেছেন। ৯ এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র একদিন আগে এই আইনি পদক্ষেপ আসামের রাজনৈতিক পরিবেশকে তীব্র উত্তাপে আনন্দিত করেছে।
পাসপোর্ট অভিযোগ যেভাবে বিতর্কে রূপ নিল
সমস্ত বিতর্কের সূত্রপাত ৫ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে কংগ্রেসের একটি সংবাদ সম্মেলনে। সেদিন পবন খেরা দাবি করেন যে CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্ত্রী রিনিকি ভূঁইয়া শর্মার কাছে তিনটি বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে — UAE, অ্যান্টিগুয়া-বার্বুডা এবং মিশরের। তিনি আরও দাবি করেন যে এই পাসপোর্টগুলো যথাক্রমে ২০২৭, ২০৩১ এবং ২০২৯ সাল পর্যন্ত বৈধ। পাশাপাশি তিনি দুবাইতে CM পরিবারের অপ্রকাশিত সম্পত্তি এবং বিদেশি শেল কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগও তোলেন। সেই রাতেই খেরা গুয়াহাটিতে উড়ে আসেন এবং প্রাক্তন ছত্তীসগড় CM ভূপেশ বাঘেলের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে একই দাবি পুনরায় করেন।
CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই অভিযোগগুলোকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে X-এ লেখেন, “এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত — আসামের মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এই চেষ্টা।” তিনি আরও জানান, “আমি এবং রিনিকি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পবন খেরার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মানহানির মামলা করব এবং তাঁকে তাঁর দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের জন্য পূর্ণ জবাবদিহি করতে হবে।” রিনিকি ভূঁইয়া শর্মা নিজেও মিডিয়ার সামনে কঠোর ভাষায় বলেন, এই অভিযোগ একটি “উন্মত্ত কুকুরের কামড়ের মতো” এবং তিনি পুলিশকে বিদেশ মন্ত্রকের সঙ্গে সমন্বয় করে সমস্ত তথ্য যাচাইয়ের আহ্বান জানান।
FIR দায়ের, পুলিশি তদন্ত ও আগাম জামিনের আবেদন
৬ এপ্রিল গুয়াহাটির ক্রাইম ব্রাঞ্চ থানায় FIR নম্বর ০০০৪/২০২৬ নথিভুক্ত হয়। রিনিকি ভূঁইয়া শর্মার অভিযোগের ভিত্তিতে পবন খেরা ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) ২০২৩-এর একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে — যার মধ্যে রয়েছে ধারা ৩(৫), ৩(৬), ৬১(২), ১৭৫, ৩১৮, ৩৩৬(৪), ৩৩৭, ৩৩৮, ৩৪০, ৩৪১(১), ৩৫১(১), ৩৫২, ৩৫৩ এবং ৩৫৬। এই ধারাগুলো নথি জালিয়াতি, জাল নথির ব্যবহার, মানহানি, ফৌজদারি ষড়যন্ত্র এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অভিপ্রায়ের মতো গুরুতর অপরাধ কভার করে।
FIR দায়েরের পর আসাম পুলিশ ও দিল্লি পুলিশের একটি যৌথ দল দিল্লিতে পবন খেরার বাসভবনে তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করে এবং তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। ৮ এপ্রিল পর্যন্ত পবন খেরা কংগ্রেসশাসিত তেলেঙ্গানায় অবস্থান করছিলেন। এই পরিস্থিতিতেই তিনি গ্রেফতার এড়াতে গুয়াহাটি হাইকোর্টে পবন খেরা আগাম জামিনের আবেদন করেন। খেরা এ প্রসঙ্গে জানান, “আমরা আরও প্রমাণ নিয়ে আসব।”
হাইকোর্টের আবেদনের আইনি ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
আগাম জামিন বা অ্যান্টিসিপেটরি বেইল হলো এমন একটি আইনি সুরক্ষা যা কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি গ্রেফতারের আগেই আদালত থেকে নিতে পারেন। এর মাধ্যমে আদালত নির্দেশ দিলে পুলিশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পর অবিলম্বে মুক্তি দিতে বাধ্য। আইনজীবীরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগের দিন এই আবেদন করা এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার কৌশল কংগ্রেসের একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ। কারণ গ্রেফতার হলে সেটিও কংগ্রেসের জন্য রাজনৈতিক সহানুভূতির উপকরণ হয়ে উঠত।
CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই পুরো ঘটনাকে “নির্বাচনী হতাশার প্রকাশ” বলে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন আদালতে সত্য প্রমাণিত হবেই। তিনি X-এ জানান যে তাঁর বিচারব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রয়েছে। অন্যদিকে কংগ্রেস দাবি করেছে, এটি বিরোধী কণ্ঠ স্তব্ধ করার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত পুলিশি হয়রানি।
আসাম নির্বাচন ও বরাক উপত্যকার পরিপ্রেক্ষিত
এই রাজনৈতিক-আইনি সংঘর্ষের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ৯ এপ্রিলের আসাম বিধানসভা নির্বাচনের পরিবেশে। হাইলাকান্দি জেলা এবং লালা টাউনের মতো বরাক উপত্যকার আসনগুলোতে ভোটাররা যখন কাল বুথে যাবেন, তখন এই বিতর্ক তাঁদের মনে তাজা থাকবে। কংগ্রেস বরাক উপত্যকায় ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী — বিশেষ করে বাংলাভাষী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে। এই মামলাকে কংগ্রেস “সরকারের ভয়ের প্রতিফলন” হিসেবে প্রচার করছে, আর BJP বলছে এটি “আইনের শাসনের বিজয়।” উভয় পক্ষের বক্তব্যই শেষ মুহূর্তে ভোটারদের মানসিকতা প্রভাবিত করার চেষ্টা। গুয়াহাটি হাইকোর্ট পবন খেরার আগাম জামিনের আবেদনে কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা আগামী কয়েক ঘণ্টায় স্পষ্ট হবে। তবে এই মামলার প্রকৃত পরিণতি নির্বাচনের পরেও দীর্ঘস্থায়ী হবে — কারণ FIR-এর ধারাগুলো গুরুতর এবং বিচার প্রক্রিয়া যদি এগোয়, তবে পবন খেরাকে বারবার আসামে আসতে হতে পারে। একই সঙ্গে রিনিকি ভূঁইয়া শর্মার পাসপোর্ট সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের দাবিও জনমানসে সক্রিয় থাকবে। রাজনৈতিক বিতর্ক যাই হোক, শেষ বিচার হবে আদালতে — এবং সত্যই সেখানে একমাত্র মাপকাঠি।