Read today's news --> ⚡️Click here 

জিরিবাম ইম্ফল রেললাইনের ৯০% কাজ শেষ, ২০২৮-এ ইতিহাস গড়বে মণিপুর

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত আসতে চলেছে। জিরিবাম ইম্ফল রেললাইন প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে এই লাইন সম্পূর্ণ চালু হলে ইম্ফল — মণিপুরের রাজধানী — প্রথমবারের মতো ভারতের জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে। ১১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেগা প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় এখন ₹২১,৮৮৫ কোটি থেকে ₹২২,২৭৫ কোটিতে পৌঁছেছে। মার্চ ২০২৬-এ নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ের (NFR) মহাব্যবস্থাপক (নির্মাণ) অশিষ বংশাল-এর নেতৃত্বে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মণিপুরের CM খেমচাঁদ ইউমনামের সঙ্গে বৈঠক করে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছেন।

প্রকল্পের বিশাল কাঠামো: সুরঙ্গ, সেতু বিশ্বরেকর্ড

জিরিবাম ইম্ফল রেললাইনটি শুধু একটি রেলপথ নয় — এটি একটি প্রকৌশল বিস্ময়। ১১১ কিলোমিটার পথে রয়েছে মোট ৬১.৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ সুরঙ্গপথ, ১১টি বড় সেতু এবং ১৩৪টি ছোট সেতু। এই লাইনের ১২ নম্বর সুরঙ্গটির দৈর্ঘ্য ১১.৫৫ কিলোমিটার, যা জম্মু-কাশ্মীরের পীর পাঞ্জাল টানেলকে ছাড়িয়ে ভারতের দীর্ঘতম রেল সুরঙ্গ হওয়ার পথে। প্রতিটি সুরঙ্গের পাশে সমান্তরালে একটি ৯.৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নিরাপত্তা সুরঙ্গও নির্মাণ করা হচ্ছে — আন্তর্জাতিক মানের প্রতি ৫০০ মিটার অন্তর জরুরি নির্গমনপথ সহ।youtube

তবে এই প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত কাঠামো হলো ব্রিজ নম্বর ৬৪ — নোনি জেলার নোনি ব্রিজ, যা ১৪১ মিটার উচ্চতায় বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলওয়ে পিয়ার ব্রিজ হিসেবে স্বীকৃত হবে। এই সেতুটির নির্মাণব্যয় একাই ₹২৮৩.৫ কোটি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এই ব্রিজের কাজ ৯৩ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছিল বলে জানা গিয়েছিল। নির্মাণসম্পন্ন হলে এটি শুধু ভারতের নয়, গোটা বিশ্বের রেলওয়ে ইতিহাসে একটি অনন্য কৃতিত্ব হয়ে উঠবে।

প্রকল্পের পুরো রুটটি হলো জিরিবাম–ভাঙাইছুংপাও–তুপুল–ইম্ফল। এই পথে মোট ৮টি নতুন রেলস্টেশন নির্মিত হচ্ছে। ৫৫.৩৬ কিলোমিটারের জিরিবাম-খংসাং অংশটি ইতিমধ্যে ২০২২ সালে চালু হয়েছে। বাকি দুটি অংশ — খংসাং-নোনি (১৮.২৫ কিমি) এবং নোনি-ইম্ফল (৩৭.০২ কিমি) — এখনও নির্মাণাধীন।

বারবার পিছিয়েছে সময়সীমা, এবার কি সত্যিই শেষ হবে?

এই প্রকল্পের ইতিহাস বারবার বিলম্বের। প্রথমে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এরপর ২০২৪ সালে CM বীরেন সিং বলেছিলেন ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ কাজ হবে। ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের মাত্র ৬৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। মণিপুরের জাতিগত সংঘাত, দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং প্রকৌশলগত জটিলতা — এই তিনটি কারণই বারবার নির্মাণকাজ ব্যাহত করেছে।

তবে মার্চ ২০২৬-এর বৈঠকে NFR কর্মকর্তারা জানিয়েছেন প্রকল্পের শারীরিক অগ্রগতি এখন প্রায় ৯০ শতাংশ। নতুন CM খেমচাঁদ ইউমনাম স্পষ্টভাবে বলেছেন, “এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প সময়মতো শেষ করতে রাজ্য সরকার সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মণিপুরের উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য এটি অপরিহার্য।” Construction World-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, নোনি ব্রিজসহ বাকি নির্মাণকাজ দ্রুততর করতে রাজ্য সরকার NFR-কে জমি ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

আসাম বরাক উপত্যকার জন্য কী অর্থ রাখে এই প্রকল্প?

জিরিবাম ইম্ফল রেললাইন শুধু মণিপুরের বিষয় নয় — এটি আসামের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জিরিবাম স্টেশনটি আসামের কাছার জেলার সীমান্তে অবস্থিত। অর্থাৎ এই লাইনটি আসামের বিদ্যমান রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গেই সংযুক্ত হবে এবং সরাসরি ইম্ফল পর্যন্ত পৌঁছাবে। হাইলাকান্দি জেলার লালা থেকে শিলচর হয়ে জিরিবামের দূরত্ব ন্যূনতম হওয়ায়, এই রেলপথ চালু হলে বরাক উপত্যকার মানুষের মণিপুর ভ্রমণ সহজ, সাশ্রয়ী এবং দ্রুততর হয়ে উঠবে।

এর বাইরে বাণিজ্যিক সুবিধাও বিশাল। মণিপুরের কৃষিজ ও উদ্যানজাত পণ্য — বিশেষত সবজি, আনারস, কমলালেবু — রেলপথে দ্রুত বরাক উপত্যকা হয়ে কলকাতা বা গুয়াহাটির বাজারে পৌঁছাতে পারবে। একইভাবে লালা-হাইলাকান্দি অঞ্চলের মাছ, চাল ও মুদি পণ্যের বাজার মণিপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ভবিষ্যতে এই লাইনটি মোরেহ পর্যন্ত প্রসারিত করে মিয়ানমারের রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে — যা ভারতের Act East Policy এবং Trans-Asian Railway পরিকল্পনার অংশ। প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং কৌশলগত নিরাপত্তা — তিনটি ক্ষেত্রেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

২০২৮-এর সময়সীমা এবার সত্যিই পূরণ হয় কিনা, তা নির্ভর করবে নির্মাণকাজের গতি বজায় থাকার উপর। ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়া একটি ইতিবাচক সংকেত হলেও, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও মৌসুমি ঝুঁকি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা পূর্ণ সতর্কতার পরামর্শ দিচ্ছেন। ইম্ফলবাসী ও উত্তর-পূর্বের কোটি কোটি মানুষ অপেক্ষায় আছেন সেই দিনের — যেদিন রেলের হুইসেল বাজবে মণিপুরের রাজধানীতে, প্রথমবারের মতো।

জিরিবাম ইম্ফল রেললাইনের ৯০% কাজ শেষ, ২০২৮-এ ইতিহাস গড়বে মণিপুর
Scroll to top