আসামে অসম মালা রাস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রাজ্যের ২৭টিরও বেশি জেলায় মোট ৯৯৬.৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ কাজ চলছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ১৮ মে ২০২৬ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম X-এ এই তথ্য জানিয়েছেন এবং বলেছেন, Asom Mala 2.0 প্রকল্পের আওতায় গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সড়ক পরিকাঠামো দ্রুতগতিতে উন্নত হচ্ছে। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ কাজেরও অগ্রগতি হচ্ছে, যা রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনতে পারে।
অসম মালা প্রকল্পের বিস্তার ও লক্ষ্য
Asom Mala রাজ্য সরকারের একটি প্রধান পরিকাঠামো উদ্যোগ, যার লক্ষ্য আসামের সড়কপথকে আধুনিক ও টেকসই করে তোলা। কেন্দ্রের Bharatmala প্রকল্পের আদলে গড়া এই কর্মসূচিতে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জেলা সড়ক ও রাজ্য সড়কগুলিকে আন্তর্জাতিক মানের হাইওয়েতে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অসম মালা রাস্তা উন্নয়ন-এর মাধ্যমে শুধু সড়ক নির্মাণ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তাঁর পোস্টে জানিয়েছেন: “আসাম একটি বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি করছে যা সংযোগ উন্নত করবে, ব্যবসা-বাণিজ্যকে বাড়াবে এবং মানুষের জীবনমান ও ব্যবসার পরিবেশকে সহজ করবে।”
Asom Mala উদ্যোগ রাজ্যের সড়ক অবকাঠামোয় বড় পরিবর্তন এনেছে। পুরনো ভাঙাচোরা রাস্তা থেকে সরে এসে আধুনিক হাইওয়ে ও সংযুক্তি করিডোর তৈরির দিকে আসাম এগোচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে পণ্য পরিবহন সহজ হচ্ছে, মানুষের যাতায়াতে সময় কমছে এবং পর্যটন ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অসম মালা রাস্তা উন্নয়ন প্রকল্প এই কারণেই কেবল নির্মাণকাজ নয়, রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক কৌশলের একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সেতু নির্মাণে অগ্রগতি: সংযোগের নতুন যুগ
সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি আসামে একাধিক বড় সেতু প্রকল্পও এগিয়ে চলেছে। মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের (CMO) পক্ষ থেকে X-এ জানানো হয়েছে, মাজুলি ও লখিমপুরকে সংযুক্তকারী সুবানসিরি ও লুইট সেতুর নির্মাণ ৬১ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। বাক্সার পাগলাদিয়া সেতু ৬৫ শতাংশ এবং লখিমপুরের ঘুনাসুতি সেতু ৪৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এই সেতু প্রকল্পগুলি Asom Mala 1.0-এর আওতায় শুরু হয়েছিল এবং মাজুলি থেকে বঙ্গাঁওমারা পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
এই সেতুগুলি সম্পূর্ণ হলে মাজুলি দ্বীপের মানুষের জীবনে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পরিবর্তন আসবে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বাজার এবং সরকারি পরিষেবায় পৌঁছানোর জন্য যে সময় ও ব্যয় আগে হতো, তা অনেকটাই কমে আসবে। ANI-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাজুলি-জোরহাট সেতু প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ২০২৭ সালের ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার। CMO জানিয়েছে, এই সেতুগুলি যাত্রাপথের সময় কমাবে, আঞ্চলিক যোগাযোগ মজবুত করবে এবং ব্যবসা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির জন্য প্রাসঙ্গিকতা
অসম মালা রাস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার পাশাপাশি বরাক উপত্যকাতেও পৌঁছানো দরকার। হাইলাকান্দি জেলা ও লালা টাউনের মতো এলাকায় সড়ক পরিকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে এখনো দুর্বল। বর্ষাকালে ভাঙা রাস্তা, জলাবদ্ধতা এবং নিম্নমানের সংযোগ সড়ক স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জীবনকে কষ্টকর করে তোলে। Asom Mala প্রকল্পের সুযোগ যদি এই অঞ্চলেও সমানভাবে বিস্তৃত হয়, তাহলে বরাক উপত্যকার তিনটি জেলার—হাইলাকান্দি, কাছাড় ও করিমগঞ্জের—দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সমস্যার সমাধান হতে পারে।
লালার মানুষের কাছে রাস্তার মানোন্নয়নের অর্থ শুধু যাতায়াতের স্বস্তি নয়। ভালো সড়ক মানে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুবিধায় সহজ প্রবেশ, এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার। Asom Mala কার্বি আংলং ও ডিমা হাসাওয়ের মতো পাহাড়ি জেলাতেও রাস্তা প্রশস্তকরণ ও উন্নয়নের কাজ করছে। সেই ধারায় বরাক উপত্যকার জেলাগুলিও অগ্রাধিকার পেলে এই অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নে নতুন গতি আসবে।
ভবিষ্যতের পথ: শুধু কিলোমিটার নয়, মান ও রক্ষণাবেক্ষণ
৯৯৬.৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের ঘোষণা আশাব্যঞ্জক, কিন্তু বাস্তবে এই প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে কি না, তা নির্ভর করে কাজের মান, সময়মতো সমাপ্তি এবং দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণের ওপর। অসম মালা রাস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের ইতিবাচক দিক হলো এটি কেবল নির্মাণে নয়, রাস্তার আয়ুষ্কাল নিশ্চিত করতেও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার কথা বলেছে। এর সঙ্গে যদি স্থানীয় পরিদর্শন, জবাবদিহিমূলক ঠিকাদারি এবং নিয়মিত মনিটরিং যুক্ত হয়, তাহলে এই বিশাল বিনিয়োগ সত্যিকারের দীর্ঘস্থায়ী ফল দেবে।
আগামী মাসগুলোতে নজর থাকবে—কোন জেলায় কত দ্রুত কাজ সম্পন্ন হচ্ছে, সেতু প্রকল্পগুলি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হচ্ছে কি না এবং বরাক উপত্যকার মতো প্রান্তিক অঞ্চলে অসম মালা রাস্তা উন্নয়ন-এর সুফল কতটা পৌঁছাচ্ছে। রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়নের এই অধ্যায় আসামের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক চিত্রকে অনেকটাই নির্ধারণ করবে।