১৪ এপ্রিল ২০২৬, বোহাগ বিহুর দিনে ছত্তিশগড়ের সক্তি জেলায় ভেদান্তা লিমিটেডের তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ বয়লার বিস্ফোরণে কমপক্ষে নয় জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৫ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ছত্তিশগড় ভেদান্তা বিস্ফোরণের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সোশ্যাল মিডিয়ায় গভীর শোক প্রকাশ করে প্রতি নিহতের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ত্রাণ তহবিল (PM National Relief Fund) থেকে ২ লক্ষ টাকা এবং প্রতিটি আহত ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। সক্তি জেলার সিংহীতরাই গ্রামে অবস্থিত এই কেন্দ্রে বিকেলের কর্মঘণ্টায় বিস্ফোরণটি ঘটে — এবং ঘটনাস্থলের ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও শ্রমিকের আটকা পড়ার আশঙ্কায় উদ্ধার অভিযান রাত পর্যন্ত চলতে থাকে।
বিস্ফোরণের বিস্তারিত: সিংহীতরাইয়ের বয়লারে বিপর্যয়
সক্তি জেলার Superintendent of Police প্রফুল্ল ঠাকুর ANI-কে জানান, “ভেদান্তা পাওয়ার প্ল্যান্টের সিংহীতরাই এলাকায় বয়লার বিস্ফোরণে ৯ জন মারা গেছেন এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের রায়গড়ের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।” বিস্ফোরণটি ঘটে বয়লার টিউবে হঠাৎ চাপ বৃদ্ধির ফলে — এত তীব্র ছিল বিস্ফোরণের শক্তি যে আশপাশের কাঠামো সম্পূর্ণ ধসে পড়ে এবং ধোঁয়া ও ধুলোয় পুরো এলাকা ঢেকে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের মুহূর্তে শ্রমিকেরা পালানোর চেষ্টা করলেও অনেকেই ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে যান।
ভেদান্তা লিমিটেডের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে জানান, “১৪ এপ্রিল বিকেলে আমাদের সিংহীতরাই প্ল্যান্টের একটি বয়লার ইউনিটে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি ঘটেছে। এতে আমাদের সাব-কন্ট্রাক্টর NGSL-এর কর্মীরা যুক্ত ছিলেন, যারা ওই ইউনিটটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন। আহতদের সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করাই এই মুহূর্তে আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।” গুরুতর আহত কয়েকজনকে রায়গড়ের Fortis হাসপাতাল এবং বিলাসপুর ও রায়পুরের বিশেষজ্ঞ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। জেলা কালেক্টর মিহির প্যাটেলের বিবরণ অনুযায়ী, নিহত সকল শ্রমিকই মধ্যপ্রদেশের হরদা ও দেওয়াস জেলার বাসিন্দা।
মোদির ক্ষতিপূরণ ঘোষণা ও রাজ্যের প্রতিক্রিয়া
প্রধানমন্ত্রী মোদি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বলেন, এই দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। তিনি ঘোষণা করেন, PM National Relief Fund থেকে প্রতিটি নিহতের পরিবার ২ লক্ষ টাকা এবং প্রতিটি আহত ব্যক্তি ৫০ হাজার টাকা পাবেন। তিনি আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনাও করেন। ছত্তিশগড়ের CM বিষ্ণুদেব সাই ঘটনাটিকে “অত্যন্ত দুঃখজনক” বলে উল্লেখ করে বলেছেন, “এই দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের মৃত্যু ও আহত হওয়ার সংবাদ অত্যন্ত পীড়াদায়ক। ঘটনার নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত নিশ্চিত করা হবে। যাঁদের গাফিলতি প্রমাণিত হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ছত্তিশগড় Congress-এর সভাপতি দীপক বৈজ এই ঘটনাকে “প্ল্যান্ট ম্যানেজমেন্ট ও প্রশাসনের চরম গাফিলতির ফল” বলে অভিহিত করেছেন এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। কেন্দ্রীয় শ্রম দপ্তর ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ও পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে এবং প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।
ভেদান্তা প্ল্যান্ট ও ভারতে শিল্প নিরাপত্তার জ্বলন্ত প্রশ্ন
ভেদান্তা লিমিটেড ভারতের অন্যতম বৃহৎ খনিজ ও শক্তি উৎপাদনকারী সংস্থা। সক্তি জেলার সিংহীতরাই প্ল্যান্টটি ছত্তিশগড়ের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এই দুর্ঘটনা আরও একবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে ভারতের তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে শ্রমিক নিরাপত্তা কতটা দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। গত বছর অক্টোবরেও এই একই সক্তি জেলায় ভেদান্তা প্ল্যান্টে লিফট দুর্ঘটনায় চারজন শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন। অর্থাৎ একই কেন্দ্রে মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় মারাত্মক দুর্ঘটনা — যা প্রশ্ন তুলছে কোম্পানির সুরক্ষা ব্যবস্থাপনার গুণমান নিয়ে।
প্রাথমিক তদন্তে বয়লারে প্রযুক্তিগত ত্রুটি, পাইপে অতিরিক্ত চাপ বৃদ্ধি অথবা নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের সম্ভাবনার দিকে তদন্তকারীরা নজর দিচ্ছেন। এই ঘটনাটি সাব-কন্ট্রাক্টর ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও উন্মোচন করেছে — কারণ নিহত ও আহত শ্রমিকেরা সরাসরি ভেদান্তার কর্মী নন, বরং সাব-কন্ট্রাক্টর NGSL-এর অধীনে কাজ করতেন। ঠিকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বীমা, চিকিৎসা সুবিধা এবং নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
আসাম ও বরাক উপত্যকার পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বার্তা
ছত্তিশগড় ভেদান্তা বিস্ফোরণের এই ঘটনা আসামের পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবারগুলোর জন্যও উদ্বেগের কারণ। হাইলাকান্দি জেলার লালা, আলগাপুর, কাটলিছেরা এবং করিমগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতি বছর বহু যুবক বাইরের রাজ্যে — বিশেষত মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে — কলকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঠিকা শ্রমিক হিসেবে কাজে যান। এই ধরনের দুর্ঘটনায় তাঁদের জীবনের ঝুঁকি কতটা বাস্তব, সেটা এই ঘটনা আবারও স্পষ্ট করে দিল।
শ্রমিক অধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্য রাজ্যে কাজে যাওয়ার আগে শ্রমিকদের নিয়োগপত্র, কর্মক্ষেত্রের বীমা (Employees’ State Insurance বা ESI) এবং Employees’ Provident Fund (EPF)-এ নথিভুক্তি আছে কিনা তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। রাজ্য সরকারের উচিত হাইলাকান্দিসহ বরাক উপত্যকার জেলাগুলোতে পরিযায়ী শ্রমিক নিবন্ধনকেন্দ্র সক্রিয় রাখা — যাতে দুর্ঘটনার পর পরিবারগুলো দ্রুত সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন।
ছত্তিশগড় ভেদান্তা বিস্ফোরণের তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয় এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় কিনা — সেটাই এখন দেশবাসীর নজরে। PM মোদির ক্ষতিপূরণ ঘোষণা আর্থিক স্বস্তি দিলেও শুধু অর্থে শেষ হয় না দায়িত্ব। প্রতিটি মৃত্যুর পর যদি শুধু ক্ষতিপূরণ ঘোষণাই হয় — কিন্তু কাঠামোগত নিরাপত্তা সংস্কার না হয় — তাহলে এই ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি থামানো সম্ভব হবে না। কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবি উঠছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে বয়লার পরিদর্শন আরও কঠোর করার এবং সাব-কন্ট্রাক্টর শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য নতুন আইনি কাঠামো প্রণয়নের।