১৪ এপ্রিল ২০২৬, বোহাগ বিহুর দিনে ছত্তিশগড়ের একটি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত চার জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন। ছত্তিশগড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বিস্ফোরণের পর বেশ কয়েকজন শ্রমিক ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাজ্য প্রশাসন ও জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (NDRF) সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে।
বিস্ফোরণের ঘটনা: কী ঘটেছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রে
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লার বিভাগে এই বিস্ফোরণটি ঘটে। বয়লারে হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে এবং আশপাশের কাঠামো ধসে পড়ে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে কেন্দ্রের একটি অংশ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে যে শ্রমিকেরা কাজ করছিলেন, তাঁদের অনেকে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত হন।
আহতদের নিকটবর্তী সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গুরুতর আহত কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রায়পুর রেফার করা হয়েছে বলে রাজ্য স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। ঘটনার পরপরই মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণুদেব সাই দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আশ্বাস দেন। তিনি জানান, উদ্ধার অভিযান যুদ্ধকালীন গতিতে চালানো হচ্ছে এবং আটকা পড়া প্রত্যেক শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযান ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
বিস্ফোরণের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে NDRF, রাজ্য পুলিশ এবং দমকল বাহিনীর দলগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকা পড়া শ্রমিকদের খোঁজে উদ্ধারকর্মীরা রাত থেকেই অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের এই ধরনের দুর্ঘটনায় ধ্বংসস্তূপে তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকায় উদ্ধারকাজ বিশেষভাবে কঠিন হয়ে পড়ে।
জেলা প্রশাসন ঘটনাস্থলে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করেছে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং পরিবারগুলোকে অবহিত করার কাজ চলছে। একই সঙ্গে রাজ্য শ্রম দপ্তর ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে — বিশেষত বয়লার পরিচালনায় নিরাপত্তাবিধি মানা হয়েছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ও পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে।
ভারতে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে দুর্ঘটনার ইতিহাস ও শ্রমিক নিরাপত্তার প্রশ্ন
ছত্তিশগড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বিস্ফোরণের এই ঘটনা ভারতের শিল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার দিকে আবারও আলো ফেলেছে। ভারতে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে দুর্ঘটনার একটি দুঃখজনক ইতিহাস রয়েছে। ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশের উঁচাহার NTPC প্ল্যান্টে বয়লার বিস্ফোরণে ৩২ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০১৯ সালে তেলেঙ্গানার NTPC রামাগুণ্ডাম প্ল্যান্টে আগুনে একাধিক শ্রমিক প্রাণ হারান। এই ঘটনাগুলো বারবার প্রশ্ন তুলেছে — তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়মিত সুরক্ষা পরিদর্শন কতটা কার্যকর হচ্ছে?
শ্রম অধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঠিকা শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ অপর্যাপ্ত। বহু ক্ষেত্রে বয়লার এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে হয় না। National Crime Records Bureau (NCRB)-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে শিল্পক্ষেত্রে প্রতি বছর হাজারেরও বেশি দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু হয় — এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত এই তালিকায় শীর্ষে থাকা ক্ষেত্রগুলির একটি।
আসাম ও বরাক উপত্যকার শ্রমিকদের জন্য সতর্কতার বার্তা
ছত্তিশগড়ের এই দুর্ঘটনা দূরের ঘটনা হলেও এর শিক্ষা আসামের জন্যও প্রাসঙ্গিক। বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জ জেলা থেকে প্রতি বছর বহু যুবক ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে — বিশেষত মহারাষ্ট্র, গুজরাট, ছত্তিশগড় এবং ওডিশায় — শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঠিকা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যান। লালা টাউনসহ হাইলাকান্দি জেলার অনেক পরিবারের সদস্য এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে কর্মরত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের নিয়োগপত্র, বীমা এবং নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের বিষয়ে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। রাজ্য সরকারের শ্রম দপ্তর ও জেলা প্রশাসনেরও উচিত পরিযায়ী শ্রমিকদের নিবন্ধন নিশ্চিত করা, যাতে দুর্ঘটনার সময় পরিবারগুলো দ্রুত তথ্য পেতে পারে এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ে সহায়তা পাওয়া যায়।
ছত্তিশগড়ের এই ভয়াবহ ছত্তিশগড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বিস্ফোরণের ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয় — এটি একটি বারবার ঘুরে আসা প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়: ভারতে শিল্প শ্রমিকের জীবনের মূল্য কতটুকু? কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সমস্ত ভারী শিল্পে নিরাপত্তা নিরীক্ষা আরও কঠোর করতে হবে, ঠিকা শ্রমিকদের বীমা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং দুর্ঘটনার পর শুধু ক্ষতিপূরণ ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে কাঠামোগত সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে। নিহতদের পরিবার বিচার পাবে কিনা এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কিনা — সেটাই এখন দেশবাসীর জিজ্ঞাসা।