১৪ এপ্রিল ২০২৬, বোহাগ বিহুর সন্ধ্যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফোন করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। প্রায় ৪০ মিনিট স্থায়ী এই ট্রাম্প-মোদি ফোনালাপে কেন্দ্রে ছিল পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবং বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখার প্রশ্ন। X-এ পোস্ট করা এক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী মোদি জানান, দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতায় অর্জিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছেন এবং সকল ক্ষেত্রে Comprehensive Global Strategic Partnership আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেছেন। এটি এ বছর দুই নেতার মধ্যে তৃতীয় ফোনালাপ — এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর দ্বিতীয়।
হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ ও সংকটের পটভূমি
পশ্চিম এশিয়ার এই সংকট শুরু হয়েছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে — কোড নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। প্রথম ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৯০০টি হামলা চালানো হয়। Britannica-র বিবরণ অনুযায়ী, ইরানের সুপ্রিম লিডার আলি খামেনেই এই হামলায় নিহত হন। ইরান পাল্টা শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও হাজার হাজার ড্রোন দিয়ে সাড়া দেয় — লেবানন, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু প্রণালীর মধ্য দিয়ে যায়। Al Jazeera-র প্রতিবেদন জানাচ্ছে, হরমুজ প্রণালী কার্যত এখন অবরুদ্ধ — যা বৈশ্বিক তেলের দাম ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে। The Print জানিয়েছে, ট্রাম্প-মোদি ফোনালাপটি হয়েছে ইসলামাবাদে মার্কিন-ইরান সরাসরি আলোচনা ভেঙে পড়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পরে। সেই আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট J.D. ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। Times of India-র বিবরণ অনুযায়ী, ইস্তানবুলে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত সামরিক অভিযানের কথাও ভাবছেন l
মোদির বার্তা: শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে ভারত
প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর X পোস্টে স্পষ্ট করেছেন — দুই নেতা শুধু হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়েই কথা বলেননি, বরং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিস্তৃত চিত্রও আলোচনায় এসেছে। Times of India-র বিবরণ অনুযায়ী, মোদি এই ফোনালাপকে “ফলপ্রসূ” বলে উল্লেখ করেছেন এবং উত্তেজনা প্রশমন ও দ্রুত শান্তি পুনরুদ্ধারে ভারতের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালী সকলের জন্য উন্মুক্ত, নিরাপদ ও সহজলভ্য রাখা অপরিহার্য।
মোদির X পোস্টের হুবহু বক্তব্য ছিল: “আমার বন্ধু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ফোন পেলাম। আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতায় অর্জিত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছি। আমরা সকল ক্ষেত্রে আমাদের Comprehensive Global Strategic Partnership আরও শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেছি এবং হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখার গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছি।” ফোনালাপের শেষে ট্রাম্প মোদিকে বলেছেন, “আমরা আপনাকে ভালোবাসি” — এই কথা জানান মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর।
ভারত-মার্কিন সম্পর্ক: বাণিজ্য থেকে নিরাপত্তা
এই তৃতীয় ফোনালাপটি বোঝার জন্য ২০২৬ সালের প্রথম দুটি ফোনালাপের প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। ২ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ও মোদি প্রথম কথা বলেছিলেন একটি বহু প্রতীক্ষিত বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতি ঘোষণা করতে। Stimson Center-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সেদিন ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের উপর মার্কিন শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা ঘোষণা করেন। এর বিনিময়ে ভারত মার্কিন পণ্যে শুল্ক শূন্যে নামানো এবং ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে ট্রাম্প জানান, যদিও ভারতীয় পক্ষ কেবল ১৮ শতাংশ শুল্কের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। White House-এর যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, ভারত মার্কিন শিল্পপণ্য ও কৃষিপণ্যে শুল্ক হয় শূন্যে নামাবে অথবা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে।stimson+1
দ্বিতীয় ফোনালাপটি হয়েছিল ২৪ মার্চ — ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর প্রথমবার — যেখানেও হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা আলোচনার বিষয় ছিল। এপ্রিলের এই তৃতীয় ফোনালাপ সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। Hindustan Times জানিয়েছে, মোদি এর আগে রাজ্যসভায় সতর্ক করে বলেছিলেন, “চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত থাকুন — এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।”
ভারত, আসাম ও বরাক উপত্যকায় তেল সংকটের ছায়া
পশ্চিম এশিয়ার এই সংঘাত কেবল দূরের কোনো ঘটনা নয় — এর প্রভাব সরাসরি এসে পড়ছে ভারতের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। ভারত তার মোট তেল আমদানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পারস্য উপসাগর থেকে সংগ্রহ করে, যার পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভরশীল। হরমুজ কার্যত বন্ধ থাকলে তেলের দাম বিশ্ববাজারে লাফ দেয় — আর সেই চাপ আসামের মতো রাজ্যেও পেট্রোল-ডিজেলের দামে এসে পড়ে। হাইলাকান্দি জেলার লালা টাউনের মতো ব্যবসাকেন্দ্রে পরিবহন খরচ বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যও ঊর্ধ্বমুখী হয়। বরাক উপত্যকার চা শিল্প এবং কৃষিপণ্যের পরিবহনেও এই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব আছে।
ট্রাম্প-মোদি ফোনালাপ একটি সংকটের মধ্যে ভারতের কূটনৈতিক সক্রিয়তার ছবি তুলে ধরে। ইরান-মার্কিন আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারত ঐতিহ্যগতভাবে পশ্চিম এশিয়ার যেকোনো সংঘাতে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে শান্তির পক্ষে কথা বলে এসেছে — এই ফোনালাপেও সেই অবস্থানই স্পষ্ট। আগামী দিনে হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নেয় এবং মার্কিন-ইরান সংঘাত আলোচনার পথে ফেরে কিনা — সেটির উপরেই নির্ভর করছে ভারতসহ গোটা বিশ্বের জ্বালানি সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।