মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে তেহরানের ভারতীয় দূতাবাস ২২ এপ্রিল ২০২৬ একটি নতুন ও কড়া পরামর্শপত্র জারি করে ইরানে ভ্রমণ না করার নির্দেশ দিয়েছে। এই পরামর্শপত্রে বিশেষভাবে বলা হয়েছে যে ভারতীয় নাগরিকরা বিমানপথে হোক বা স্থলপথে — কোনো পথেই ইরানে যাবেন না। একইসঙ্গে, যাঁরা বর্তমানে ইরানে অবস্থান করছেন তাঁদের অবিলম্বে নির্ধারিত স্থলবন্দর দিয়ে দেশ ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইরান-মার্কিন যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় এই পরামর্শপত্র বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
নতুন পরামর্শপত্রের পটভূমি: ৭ এপ্রিল থেকে ধারাবাহিক সতর্কতা
এপ্রিল ২০২৬ সালের শুরু থেকেই ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক (MEA) ও তেহরান দূতাবাস একের পর এক পরামর্শপত্র জারি করে আসছে। MEA-র অফিশিয়াল পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, ৭ এপ্রিল ২০২৬ প্রথম জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল — যাতে ইরানে থাকা সমস্ত ভারতীয় নাগরিককে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা বাড়ির ভেতরে থাকতে বলা হয়। ওই সতর্কতায় বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সংবেদনশীল সামরিক স্থাপনা থেকে দূরে থাকুন এবং বহুতল ভবনের উপরের তলায় অবস্থান এড়িয়ে চলুন।
৮ এপ্রিলের পরামর্শপত্রে ইরানে থাকা নাগরিকদের “অবিলম্বে দেশ ত্যাগ” করতে বলা হয় এবং শুধুমাত্র দূতাবাস-নির্দেশিত পথ ব্যবহার করে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই পরামর্শপত্রগুলো জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ক্রমাগত আপডেট হচ্ছে এবং প্রতিটি নতুন পরামর্শপত্র আগেরটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জারি করা হচ্ছে।
ইরানে ভ্রমণ না করার নির্দেশ কেন: মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি
তেহরানের ভারতীয় দূতাবাসের সর্বশেষ ২২ এপ্রিলের পরামর্শপত্রে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ভারত ও ইরানের মধ্যে কিছু বিমান চলাচল পুনরায় শুরুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত এবং বিমান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি বলে সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে। পরামর্শপত্রে বলা হয়েছে: “ভারত ও ইরানের মধ্যে কিছু বিমান পরিষেবা শুরুর খবরের প্রেক্ষিতে ও আগের পরামর্শগুলো অব্যাহত রেখে, ভারতীয় নাগরিকদের দৃঢ়ভাবে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বিমান বা স্থলপথে — কোনো পথেই ইরানে ভ্রমণ না করতে।”
এই পরামর্শপত্রের পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়েছেন বলে জানা গেছে, কিন্তু একই সঙ্গে মার্কিন নৌবহর হরমুজ প্রণালীতে নাকাবন্দি অব্যাহত রেখেছে। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের IRGC গানবোট সম্প্রতি একটি কন্টেইনারশিপের কাছে এসে গুলি ছুড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক বিমান চলাচল ও সামুদ্রিক রুট দুটোই চাপে রয়েছে।
ইরানে আটকে পড়া ভারতীয়দের জন্য দূতাবাসের হেল্পলাইন
যাঁরা বর্তমানে ইরানে রয়েছেন তাঁদের জন্য তেহরান দূতাবাস চব্বিশ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালু রেখেছে। দূতাবাসের জরুরি যোগাযোগ নম্বরগুলো হল: +৯৮ ৯১২ ৮১০ ৯১১৫, +৯৮ ৯১২ ৮১০ ৯১০২, +৯৮ ৯১২ ৮১০ ৯১০৯, +৯৮ ৯৯৩ ২১৭ ৯৩৫৯ এবং ইমেল: [email protected]। দূতাবাস স্পষ্ট জানিয়েছে, যাঁরা দূতাবাসের সমন্বয় ছাড়াই ইরানি ভূখণ্ড ছেড়ে তৃতীয় দেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করবেন, তাঁদের পরে সহায়তা করা দূতাবাসের পক্ষে সম্ভব হবে না।
ইরানে কত জন ভারতীয় রয়েছেন তার সঠিক সংখ্যা সরকার প্রকাশ করেনি। তবে জানুয়ারি ২০২৬-এ MEA-র একটি সামাজিক মাধ্যম পোস্টে বলা হয়েছিল, ১০,০০০-এরও বেশি ভারতীয় নাগরিক ইরানে রয়েছেন — যাঁদের মধ্যে শিক্ষার্থী, তীর্থযাত্রী, ব্যবসায়ী ও পেশাদার কর্মীরা রয়েছেন।
আসাম ও হাইলাকান্দির বাসিন্দাদের জন্য প্রাসঙ্গিক তথ্য
ইরানে ভ্রমণ না করার এই নির্দেশ বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি বিশেষ অংশের জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক। প্রতি বছর এই অঞ্চল থেকে অনেকে শিয়া মুসলিমদের পবিত্র তীর্থস্থান কর্বালা (ইরাক) ও মাশহাদ (ইরান) যিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ইরানে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার ফলে এই তীর্থযাত্রার পরিকল্পনা করে রাখা পরিবারগুলোকে আপাতত তাদের সফর স্থগিত রাখতে হবে।
এছাড়াও, বরাক উপত্যকার কিছু ব্যবসায়ী ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে পণ্য বাণিজ্যে যুক্ত। হরমুজ প্রণালীতে চলমান উত্তেজনা ও নাকাবন্দির কারণে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বাড়তে পারে — যার পরোক্ষ প্রভাব দেশীয় বাজারেও পড়তে পারে। তেলের দাম এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্যে যেকোনো ওঠানামা সরাসরি পণ্যমূল্যে প্রতিফলিত হয় বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
পরিস্থিতি নজরে রাখুন: ইরান সংকট কোথায় যাচ্ছে
ইরানে ভ্রমণ না করার নির্দেশ কতদিন বলবৎ থাকবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই যুদ্ধবিরতি উল্লঙ্ঘনের পরস্পর বিরোধী অভিযোগ করছে এবং কূটনৈতিক আলোচনার পরবর্তী দফার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ভারত সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে হরমুজ প্রণালীতে অবাধ যাতায়াতের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে ভারতের অবস্থান অপরিবর্তিত। ইরানে যাওয়ার পরিকল্পনা যাঁরা করেছিলেন, তাঁদের MEA-র অফিশিয়াল ওয়েবসাইট mea.gov.in এবং indianembassytehran.gov.in নিয়মিত অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে — কারণ পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে পরামর্শপত্র আপডেট করা হবে।