আসামের কাছাড় জেলার লাখিপুরে একই দিনে পরিচালিত দুটি পৃথক মাদকবিরোধী অভিযানে কাছাড় পুলিশ সাফল্য পেয়েছে। ২৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সুনাবাড়িঘাট বাইপাস এলাকায় পরিচালিত এই অভিযানে মোট ৪০৬ গ্রামেরও বেশি হেরোইন উদ্ধার করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য আড়াই কোটি টাকারও বেশি। লাখিপুরে হেরোইন উদ্ধারের এই ঘটনায় মোট পাঁচজন মাদক পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উভয় অভিযানেই নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ যানবাহন আটক করে এই বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে।
দুটি অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ
প্রথম অভিযানে লাখিপুর থানার পুলিশ সুনাবাড়িঘাট বাইপাস এলাকায় একটি যানবাহন আটক করে। তল্লাশিতে সাবানের কৌটার ভেতরে লুকানো হেরোইন পাওয়া যায়। এই অভিযানে একজনকে গ্রেফতার করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযানে আরো চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবির আহমেদ বড়ভূঁইয়া, সাহিন আহমেদ লস্কর, আনোয়ার হোসেন বড়ভূঁইয়া এবং আরও একজন। উভয় ঘটনাতেই উদ্ধার হওয়া মাদকদ্রব্য সাবানের কৌটার গোপন কুঠরিতে লুকিয়ে পরিবহন করা হচ্ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। লাখিপুরে হেরোইন উদ্ধারের এই পদ্ধতি আগেও একাধিকবার এই রুটে ব্যবহার করা হয়েছে বলে তদন্তকারীরা নিশ্চিত করেছেন।
এর মাত্র দুইদিন আগে — ২২ এপ্রিল — শিলচরের রামনগর বাইপাস এলাকায় কাছাড় পুলিশ আরেকটি অভিযানে ৪৫৬ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করেছিল, যার বাজারমূল্য প্রায় ২.৩ কোটি টাকা। সেই অভিযানে মিজোরামের নম্বরপ্লেটের একটি SUV থেকে ৩৯টি সাবানের কেসে লুকানো হেরোইন উদ্ধার হয়। গ্রেফতার দুজন — ফাহিম আহমেদ বড়ভূঁইয়া (২৫) এবং হানিফ আহমেদ লস্কর (৩১)।
মিজোরাম থেকে বরাক উপত্যকা: মাদক পাচারের মূল রুট
কাছাড় পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) রাজত কুমার পাল জানিয়েছেন, “প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মিজোরাম থেকে শিলচর হয়ে এই মাদক দেশের অন্যান্য অংশে পাঠানো হচ্ছিল।” তদন্তকারীরা মাদক নেটওয়ার্কের সামনের ও পেছনের সংযোগ খুঁজে বের করতে জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে কাছাড়ের Senior Superintendent of Police সঞ্জীব সাইকিয়ার নেতৃত্বে, অতিরিক্ত SP এবং শিলচর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সক্রিয় অংশগ্রহণে। গত বছর আগস্ট মাসেও কাছাড় পুলিশ এই একই সুনাবাড়িঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২১৬ গ্রাম হেরোইন ও ২০,০০০ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছিল — সেই অভিযানেও পাঁচজন গ্রেফতার হয়েছিল। এই তথ্য প্রমাণ করে, সুনাবাড়িঘাট বাইপাস মাদক পাচারকারীদের একটি নিয়মিত ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে উঠেছে।
লাখিপুরে হেরোইন উদ্ধার: বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রেক্ষাপট
লাখিপুরে হেরোইন উদ্ধারের এই ঘটনাগুলি বরাক উপত্যকার মাদক সমস্যার গভীরতার একটি স্পষ্ট প্রমাণ। লালা টাউন ও হাইলাকান্দি জেলার পাঠকদের জন্য এই সংবাদ সরাসরি প্রাসঙ্গিক — কারণ লাখিপুর কাছাড় জেলায় হলেও এই মাদক পাচারের রুটটি বরাক উপত্যকার সমগ্র এলাকায় প্রভাব ফেলে। হাইলাকান্দি জেলার ক্যাটলিছড়া ও লালা এলাকাও এই মাদক নেটওয়ার্কের নাগালের মধ্যে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কাছাড়ের SSP নুমল মহত্তা জানিয়েছিলেন, “এই নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত কারো বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” বরাক উপত্যকায় মাদকের অনুপ্রবেশ শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয় — এটি সামাজিক সমস্যাও। হাইলাকান্দি, কাছাড় ও করিমগঞ্জ — এই তিনটি জেলায় মাদকাসক্তির হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে স্থানীয় সমাজকর্মীরা জানাচ্ছেন। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদকের বিস্তার রোধ করতে এই অভিযানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ধারাবাহিক অভিযান ও কাছাড় পুলিশের সাফল্য
এপ্রিল ২০২৬ মাসটি কাছাড় পুলিশের জন্য অত্যন্ত সক্রিয় একটি মাস হয়েছে। লাখিপুর অভিযানের আগে, ২১ এপ্রিল রামনগর বাইপাসে দুজনকে গ্রেফতার করা হয় — ফাহিম আহমেদ বড়ভূঁইয়া ও হানিফ আহমেদ লস্কর — এবং তাদের কাছ থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকার হেরোইন উদ্ধার হয় বলে জানিয়েছে। এর আগে অক্টোবর ২০২৫-এ কাছাড়ের উজান তারাপুর এলাকায় লাখিপুর থানার পুলিশ Assam Rifles-এর সহায়তায় একটি মিজোরামের গাড়ি থেকে ৪০১ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করেছিল এবং পথারকান্দির দিলওয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করেছিল।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ Assam Rifles ও কাছাড় পুলিশের যৌথ অভিযানে ৪.০৫ কোটি টাকার হেরোইন উদ্ধারের ঘটনাও এই একই জেলায় ঘটেছে। সব মিলিয়ে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে কাছাড়ে বহু কোটি টাকার মাদক উদ্ধার প্রমাণ করে, বরাক উপত্যকা মিজোরাম-বাংলাদেশ রুটে মাদক পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট করিডোর হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক সাফল্য অবশ্যই আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শুধু গ্রেফতার ও উদ্ধার অভিযানে মাদক পাচার পুরোপুরি বন্ধ হবে না — মাদকের চাহিদা কমাতে সামাজিক সচেতনতা, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা একইসঙ্গে জরুরি। আগামী দিনে কাছাড় পুলিশ মাদক নেটওয়ার্কের উপরের স্তরে পৌঁছাতে পারবে কি না — সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।