প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সিকিম রাজ্যের ৫০তম রাজ্যত্ব বার্ষিকীর সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ২৭–২৮ এপ্রিল দুই দিনের সরকারি সফরে গ্যাংটকে এসেছেন। মোদির সিকিম সফরে ৪,০০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প উদ্বোধন, উৎসর্গ ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। ২৮ এপ্রিল সকাল ১০টায় গ্যাংটকের পালজোর স্টেডিয়ামে সুবর্ণজয়ন্তীর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জনসাধারণের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন এবং বহুল প্রতীক্ষিত এই প্রকল্পগুলোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করবেন।
দুই দিনের সফরসূচি: গ্যাংটকে মোদির কর্মসূচি
প্রধানমন্ত্রী মোদি ২৭ এপ্রিল বিকেল প্রায় ৩টায় গ্যাংটকের লিবিং হেলিপ্যাডে অবতরণ করেন। সেখান থেকে লোক ভবন পর্যন্ত একটি বিশেষ রোড শো অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে স্থানীয় মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। পরের দিন ২৮ এপ্রিল সকাল ৯:৩০ মিনিটে তিনি গ্যাংটকের অর্কিডেরিয়াম পরিদর্শন করবেন, যেখানে সিকিমের পরিবেশগত ও ফুলের বৈচিত্র্য প্রদর্শনের জন্য “স্বর্ণজয়ন্তী মৈত্রী মঞ্জরী পার্ক” একটি বিশ্বমানের অর্কিড অভিজ্ঞতা কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।
পালজোর স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদির সিকিম সফরে ৪,০০০ কোটি টাকার প্রকল্পগুলোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। এই প্রকল্পগুলো পরিকাঠামো, যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, নগর উন্নয়ন, পরিবেশ, পর্যটন ও কৃষি — মোট নয়টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিস্তৃত।
৪,০০০ কোটি টাকার প্রকল্পে কী কী আছে
স্বাস্থ্যসেবা খাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এই সফরে উদ্বোধিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নামচি জেলার ইয়াংগ্যাংয়ে একটি ১০০ শয্যার আয়ুর্বেদ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন এবং NIT দেওরালিতে একটি ৩০ শয্যার সমন্বিত সোওয়া রিগপা হাসপাতাল উদ্বোধন করবেন। সোওয়া রিগপা হলো হিমালয় অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি, যা ভুটান ও তিব্বতীয় সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত।
বিদ্যুৎ ও নগর উন্নয়ন খাতে প্রধানমন্ত্রী গ্যাংটকের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, জন সেবা সচিবালয় ও সিভিল সার্ভিস অফিসার্স ইনস্টিটিউট উদ্বোধন করবেন। পর্যটন খাতে গ্যাংটকের রিজ প্রিসিংক্টের পুনর্নির্মাণ কাজ ও কৈলাস মানসরোবর যাত্রার পরিকাঠামো উদ্বোধন করা হবে। এছাড়া একটি ইকো-পিলগ্রিমেজ কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করা হবে। বিভিন্ন সরকারি আবাসন প্রকল্প, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং নদী দূষণ রোধে উদ্যোগও এই প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত।
সিকিমের ৫০ বছরের পথচলা: ইতিহাস ও তাৎপর্য
১৯৭৫ সালের ১৬ মে সিকিম আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের ২২তম রাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। পঞ্চাশ বছর আগের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত থেকে শুরু হয়ে আজ সিকিম পরিবেশ-বান্ধব পর্যটন, জৈব কৃষি ও টেকসই উন্নয়নের মডেল রাজ্য হিসেবে সারা দেশে পরিচিত। ২০২৫ সালের ১৬ মে থেকে শুরু হওয়া এই সুবর্ণজয়ন্তী বছরব্যাপী উদযাপনের সমাপনী অধ্যায় হলো এই দুই দিনের অনুষ্ঠান, যেখানে প্রধানমন্ত্রী মোদির উপস্থিতি বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।
উল্লেখযোগ্য যে ২০২৫ সালের মে মাসেও প্রধানমন্ত্রী মোদি ভিডিওকনফারেন্সের মাধ্যমে “Sikkim@50” অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। তখন স্বশরীরে উপস্থিত না থাকলেও এবার দুই দিনের সরাসরি সফর সিকিমের জন্য রাজনৈতিক ও উন্নয়নগত দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রেক্ষাপটে এই সফরের তাৎপর্য
মোদির সিকিম সফর শুধু একটি রাজ্যের জন্য নয়, সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। কেন্দ্রীয় সরকার ক্রমাগত উত্তর-পূর্ব ভারতের পরিকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। অসমের পার্শ্ববর্তী রাজ্য হিসেবে সিকিমে এই বিপুল বিনিয়োগ পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক সংযোগ ও পর্যটন বিকাশে সহায়ক হবে।
হাইলাকান্দি জেলার মানুষের জন্যও এই খবরটি প্রাসঙ্গিক, কারণ উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি রাজ্যে কেন্দ্রীয় উন্নয়ন বিনিয়োগের মডেল অন্য রাজ্যগুলোতেও প্রতিফলিত হয়। অসমেও কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ প্রকল্পের বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। বরাক উপত্যকার মতো পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে এই ধরনের কেন্দ্রীয় মনোযোগ আরও বাড়ুক — এটাই হাইলাকান্দি ও লালার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা।
২৮ এপ্রিলের পালজোর স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠান শেষে সিকিমের উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু হবে। মোদির সিকিম সফরে ৪,০০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পগুলো কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং রাজ্যের সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনে — সেটাই হবে আগামী দিনের মূল পরীক্ষা। উত্তর-পূর্বের মানুষ এখন অনুষ্ঠানের ঘোষণা নয়, বাস্তব পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন।