পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা হয়েছে। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মঙ্গলবার সামাজিক মাধ্যমে মমতার ওই বক্তব্যকে “বিপজ্জনক, বিভাজনমূলক ও সাম্প্রদায়িক” বলে অভিহিত করে কড়া সমালোচনা করেছেন। হিমন্ত-মমতা হিন্দু নিরাপত্তা বিতর্ক এমন সময়ে সামনে এল যখন পশ্চিমবঙ্গে ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ হতে চলেছে এবং ৪ মে ফলাফল ঘোষণার কথা রয়েছে। মার্চ ২০২৬-এ কলকাতার একটি ধর্না কর্মসূচিতে মমতা বলেছিলেন — “আমরা আছি বলেই তোমরা নিরাপদ। আমরা না থাকলে, যখন একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায় একজোট হয়ে তোমাদের ঘিরে ধরবে, তারা তোমাদের এক সেকেন্ডেই শেষ করে দেবে।”
মমতার বক্তব্যে কী ছিল এবং কেন বিতর্ক
৮ মার্চ ২০২৬ কলকাতার ধর্না সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক মন্তব্য করেছিলেন যা দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ওই বক্তব্যে তিনি ইঙ্গিত করেন যে তাঁর সরকার ক্ষমতায় না থাকলে হিন্দু সম্প্রদায় অন্য একটি অনির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের হাত থেকে নিরাপদ থাকবে না। BJP-র জাতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারী এই মন্তব্যকে “হিন্দুদের প্রতি প্রকাশ্য হুমকি” বলে অভিহিত করেন। মমতার এই মন্তব্য উদ্বেগজনক এবং তা ওয়াইএসআইআইএম নেতা আকবরুদ্দিন ওয়াইসির মতো সাম্প্রদায়িক বক্তব্যের সমতুল্য।
মমতার এই বক্তব্য মূলত একটি জটিল রাজনৈতিক অঙ্কের অংশ। একদিকে BJP-র “হিন্দুত্ব” প্রচারণার মোকাবিলায় TMC “সফট হিন্দুত্ব” কৌশল নিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। অন্যদিকে মমতার এই বক্তব্য অনিচ্ছাকৃতভাবেই এমন একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে একটি সম্প্রদায়কে সম্ভাব্য আক্রমণকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কংগ্রেস ও বামফ্রন্টও এই মন্তব্যকে “ভোটের আগে ভোটারদের মধ্যে বিভাজন তৈরির মরিয়া চেষ্টা” বলে নিন্দা করেছে।
হিমন্তের পাল্টা আক্রমণ: সন্দেশখালি থেকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন যে মমতার এই ধরনের মন্তব্য “একজন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে সম্পূর্ণ অনুচিত” এবং এটি সমাজের সম্প্রীতিকে বিপন্ন করতে পারে। তিনি আরও লিখেছেন, “বাংলাকে এখনই বাঁচাতে হবে।” হিমন্তের যুক্তি হল — কোনো মুখ্যমন্ত্রী যদি বলেন যে তাঁর ব্যক্তিগত উপস্থিতির কারণে নাগরিকরা নিরাপদ, তাহলে সেটি আসলে শক্তিশালী প্রশাসনের প্রমাণ নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতারই স্বীকৃতি।
হিমন্ত সন্দেশখালি কাণ্ডের প্রসঙ্গও টেনেছেন — যেখানে শাসকদলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মহিলারা শোষণ ও জমি দখলের অভিযোগ এনেছিলেন। তাঁর মতে এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে একটি ব্যাপক ভয়ের পরিবেশ তৈরির ইঙ্গিত দেয়। অসমের CM স্পষ্ট করেছেন যে পশ্চিমবঙ্গে TMC-র বিরুদ্ধে BJP “আপোষমূলক রাজনীতি, দাঙ্গা, সিন্ডিকেট শাসন ও সহিংসতা”র অভিযোগে নির্বাচনী লড়াই করছে। TMC এই সব অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং পাল্টা বলেছে BJP “বাংলা-বিরোধী” এবং বাংলার সামাজিক ও ভাষাগত পরিচয়কে মুছে ফেলতে চাইছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রেক্ষাপট: ৯৩% ভোটদান, ৪ মে ফলাফল
এই রাজনৈতিক বিতর্কের পটভূমিতে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচন, যেখানে ২৯৪টি আসনের জন্য দুই দফায় ভোট হচ্ছে — ২৩ এপ্রিল প্রথম দফা এবং ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফা। প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে এবং সামগ্রিক ভোটদানের হার ছিল ৯৩.১৯% — রাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ। এই অভূতপূর্ব ভোটদানের হারকে TMC বলছে মমতার পক্ষে গণ-সমর্থনের ইঙ্গিত, আর BJP-র দাবি এই বিশাল অংশগ্রহণ আসলে “পরিবর্তন”র স্বপক্ষে মানুষের রায়ের প্রকাশ। ২০২১ সালের নির্বাচনে TMC ২১৫টি আসন পেয়ে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে, আর BJP ৭৭টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২০২৪ লোকসভায় TMC ২৯টি আসন পেলেও BJP পায় মাত্র ১২টি — যা BJP-র জন্য এক বড় ধাক্কা ছিল। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে BJP সেই ব্যবধান কমাতে মরিয়া, আর হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মতো আক্রমণাত্মক বক্তারা সেই প্রচারণার মুখ হয়ে উঠেছেন।
অসম ও বরাক উপত্যকার প্রাসঙ্গিকতা
হিমন্ত-মমতা হিন্দু নিরাপত্তা বিতর্ক সরাসরি অসম ও বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক পরিবেশকেও প্রভাবিত করে। হাইলাকান্দি জেলাসহ বরাক উপত্যকায় হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বাস করেন এবং এই অঞ্চলের সামাজিক সম্প্রীতি ঐতিহাসিকভাবেই মূল্যবান। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক বিতর্ক অসমের রাজনীতিতেও আলোড়ন ফেলে — কারণ উভয় রাজ্যেই ধর্মীয় পরিচয় ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রশ্নটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল।
লালা শহর ও হাইলাকান্দির বাসিন্দারা স্বাভাবিকভাবেই পার্শ্ববর্তী রাজ্যের রাজনৈতিক ঘটনাবলি ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করেন, কারণ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত নৈকট্য রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে এই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য প্রতিটি স্থানীয় পরিসরেই সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস ও উদ্বেগের বীজ বপন করতে পারে — যা কোনো দলের জন্য ভোট হয়তো এনে দেয়, কিন্তু সমাজের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে।
২৯ এপ্রিলের দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ৪ মে যে ফলাফল আসবে, তা শুধু পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না — বরং ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য কতটা কার্যকর তা-ও স্পষ্ট করবে। হিমন্তের এই আক্রমণাত্মক প্রচারণা এবং TMC-র পাল্টা অবস্থান — উভয়ই এই নির্বাচনকে ২০২৬ সালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াইয়ে পরিণত করেছে।