১ মে ২০২৬ থেকে ভারতে বাণিজ্যিক LPG সিলিন্ডার মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হয়েছে — এবারের বৃদ্ধির পরিমাণ ৯৯৩ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে একটিমাত্র সংশোধনে সর্বোচ্চ। দিল্লিতে ১৯ কেজির বাণিজ্যিক LPG সিলিন্ডারের নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ৩,০৭১ টাকা ৫০ পয়সা — যেখানে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত তা ছিল ২,০৭৮ টাকা ৫০ পয়সা। পশ্চিম এশিয়ায় ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এটি তৃতীয় পর পর মূল্যবৃদ্ধি। গৃহস্থালির LPG সিলিন্ডারের দাম অবশ্য অপরিবর্তিত আছে — দিল্লিতে ১৪.২ কেজির সিলিন্ডার ৯১৩ টাকাতেই রয়েছে।
তিন মাসে ১,৩০৩ টাকা বৃদ্ধি — পুরো চিত্রটি কী
এই মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপট বুঝতে গত তিন মাসের তথ্য একসঙ্গে দেখা দরকার। ১ মার্চ ২০২৬-এ বাণিজ্যিক LPG সিলিন্ডারের দাম বেড়েছিল ১১৪ টাকা ৫০ পয়সা — এটি ছিল ইরান যুদ্ধ শুরুর (২৮ ফেব্রুয়ারি) পরই প্রথম মূল্য সংশোধন। এপ্রিল মাসে দ্বিতীয় দফায় বৃদ্ধি হয়েছিল আরও ১৯৫ টাকা ৫০ পয়সা। আর ১ মে-র তৃতীয় দফায় সেই বৃদ্ধির পরিমাণ এক লাফে দাঁড়িয়েছে ৯৯৩ টাকায়। এই তিন দফায় মোট বাণিজ্যিক LPG-র দাম বেড়েছে ১,৩০৩ টাকা।
মুম্বাইতে একই সিলিন্ডার এখন বিক্রি হচ্ছে ৩,০২৪ টাকায় — যেখানে আগে ছিল ২,০৩১ টাকা। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, ভারত পেট্রোলিয়াম ও হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম — তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থা প্রতি মাসের ১ তারিখ আন্তর্জাতিক বাজারদর ও বিনিময় হারের ভিত্তিতে ATF ও LPG-র দাম সংশোধন করে। এবার সেই সংশোধনে রেকর্ড বৃদ্ধি হওয়ার কারণ, মূলত হরমুজ প্রণালীতে সরবরাহ বিঘ্ন ও বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের মূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া।
বৈশ্বিক কারণ: ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী
এই বাণিজ্যিক LPG সিলিন্ডার মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ ভূরাজনৈতিক। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে পশ্চিম এশিয়ায় ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তীব্র হয়। হরমুজ প্রণালী — বিশ্বের মোট সামুদ্রিক তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ যা দিয়ে যায় — সেখানে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে বলে Economic Times-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে মেটায় — ফলে বৈশ্বিক তেলের দামে এই বিশাল পরিবর্তন সরাসরি দেশীয় জ্বালানি মূল্যে প্রতিফলিত হচ্ছে।
কংগ্রেস এই মূল্যবৃদ্ধির কড়া সমালোচনা করেছে। কংগ্রেস PM মোদিকে “মুদ্রাস্ফীতির মানুষ” বলে অভিহিত করে দাবি করেছে যে, সরকার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসার উপর এই বোঝা চাপানোর আগে বিকল্প বিবেচনা করেনি। যদিও কেন্দ্রীয় সরকার পাল্টা যুক্তি দিচ্ছে যে গৃহস্থালি সিলিন্ডারের দাম না বাড়িয়ে সাধারণ পরিবারগুলোকে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে।
হোটেল-রেস্তোরাঁয় সরাসরি আঘাত — খাবারের দাম বাড়তে পারে
বাণিজ্যিক LPG সিলিন্ডার মূল্যবৃদ্ধির প্রথম ও সবচেয়ে বড় শিকার হোটেল, রেস্তোরাঁ, ঢাবা ও খাদ্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তারা। একটি সাধারণ ভারতীয় রেস্তোরাঁর মোট পরিচালনা ব্যয়ের ৮ থেকে ১৫ শতাংশ যায় জ্বালানিতে। তিন মাসে ১,৩০৩ টাকার সঞ্চিত বৃদ্ধি রেস্তোরাঁ মালিকদের লাভের মার্জিন মারাত্মকভাবে চাপে ফেলেছে।
বেঙ্গালুরু বৃহৎ হোটেলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পি.সি. রাও বলেছিলেন, “হোটেলদের আগে বাণিজ্যিক সিলিন্ডারে প্রায় ১৫০ টাকা ছাড় দেওয়া হতো। সেটি ১ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। তার উপর এখন দাম বাড়ানো হয়েছে — ফলে আমাদের উপর প্রতি সিলিন্ডারে মোট প্রভাব পড়ছে ২৬৫ টাকারও বেশি।” তিনি আরও বলেছিলেন, রান্নার তেলের দাম কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে এবং কাজু সহ শুকনো ফলের দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে — সব মিলিয়ে রেস্তোরাঁ মালিকরা মেনু পর্যালোচনা করতে বাধ্য হতে পারেন। বাইরে খাওয়া ও ফুড ডেলিভারি কিছুটা ব্যয়বহুল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লালা ও হাইলাকান্দিতে কী প্রভাব পড়বে
গৃহস্থালির সিলিন্ডারের দাম অপরিবর্তিত থাকায় লালা বা হাইলাকান্দির সাধারণ পরিবারগুলোর রান্নার খরচ এখনই সরাসরি বাড়ছে না। কিন্তু এই বাণিজ্যিক LPG সিলিন্ডার মূল্যবৃদ্ধির পরোক্ষ প্রভাব অনুভূত হবেই — বিশেষত স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, চা দোকান ও ছোট খাবার ব্যবসায়। লালা টাউনের যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ১৯ কেজির বাণিজ্যিক সিলিন্ডার ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তাঁদের মাসিক জ্বালানি খরচ এখন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার বাজারে দৈনন্দিন খাবারের দাম সামান্য বাড়লেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক তেলের দাম আরও চাপে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ১ জুন ২০২৬-এর মাসিক মূল্য সংশোধনে আরও বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনাকে বিশ্লেষকরা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। গৃহস্থালির সিলিন্ডারের দাম ধরে রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত আপাতত স্বস্তির কারণ হলেও, ব্যবসায়িক খরচের ঊর্ধ্বগতি একটা পর্যায়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবেই — সেটা খাবারের দামের মাধ্যমে হোক বা অন্য কোনো পণ্য ও পরিষেবার মাধ্যমে। লালাবাজার.কম পরবর্তী মূল্য সংশোধন ও স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব নিয়ে পাঠকদের আপডেট রাখবে।