অসম সরকার ব্রহ্মপুত্র নদীর চর ও চাপরিগুলোর জন্য একটি বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত নীতিকাঠামো তৈরির পথে এগিয়ে চলেছে। ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে গুয়াহাটির অসম সচিবালয়ে মুখ্যসচিব ড. রবি কোটার সভাপতিত্বে এই খসড়া নীতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শমূলক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র চর দ্বীপ বিজ্ঞানভিত্তিক নীতির এই উদ্যোগটি ব্রহ্মপুত্র বোর্ডের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে এবং এটি নদীর চরাঞ্চলে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও পরিবেশ দুটোকেই সরাসরি প্রভাবিত করবে। অসমে বর্তমানে ৯৭১টি ম্যাপ করা নদী দ্বীপ রয়েছে — যেগুলো রাজ্যের মোট আয়তনের প্রায় ৮.৫ শতাংশ এলাকা জুড়ে আছে এবং সেখানে বাস করেন প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষ।
চর-চাপরির বাস্তবতা: পরিবেশ ও মানুষ দুটোই বিপন্ন
মুখ্যসচিব ড. রবি কোটা বৈঠকে স্পষ্ট করেছেন যে ব্রহ্মপুত্রের চর ও চাপরিগুলো পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গতিশীল এবং জটিল। এই দ্বীপগুলোর আকার ও অবস্থান নদীর ভাঙন, পলি জমা, বন্যা এবং ভূমিকম্পের প্রভাবে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় সেখানকার বাসিন্দাদের জমির মালিকানা প্রায়ই অনিশ্চিত, জনঘনত্ব বেশি এবং অনিয়ন্ত্রিত বসতি, বন কাটা, রাসায়নিক কৃষি ও অবৈধ বালি উত্তোলনের মতো মানবিক চাপ পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে।
অসমের রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ রাজ্যের মোট ভূমির মাত্র ৪.৬ শতাংশ জায়গায় বাস করেন — এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ জনবসতিই এই চরাঞ্চলের মূল সমস্যাটিকে তুলে ধরে। একদিকে বাস্তুতন্ত্র ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সেখানকার মানুষ বন্যা ও ভাঙনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিতে জীবন কাটাচ্ছেন। এই দ্বৈত সংকটের মোকাবিলায় একটি সামগ্রিক বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
খসড়া নীতিতে কী কী প্রস্তাব রয়েছে
ব্রহ্মপুত্র বোর্ড ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি খানাপাড়ার রোহিকা-তে একটি কর্মশালায় প্রথমবার এই খসড়া নীতির বিষয়গুলো বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সামনে উপস্থাপন করে। পরামর্শমূলক বৈঠকে মুখ্যসচিব ড. কোটা যে মূল প্রস্তাবগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন সেগুলো হলো: জোনিং-ভিত্তিক ল্যান্ডস্কেপ পদ্ধতি অনুসরণ, নতুন নির্মাণ ও বসতি সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ, অতিক্রমণ প্রতিরোধ, জৈব কৃষি উন্নয়ন এবং সুপরিকল্পিত ইকো-ট্যুরিজম উৎসাহ দেওয়া।
এর পাশাপাশি প্রকৃতি-ভিত্তিক নদীতীর স্থিরীকরণ, জীববৈচিত্র্য করিডোর সুরক্ষা এবং নদীর হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যাল ভারসাম্য বজায় রাখার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মুখ্যসচিব সমস্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন নীতিটি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই তাদের মতামত ও পরামর্শ দিতে, যাতে একটি বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই কাঠামো তৈরি হয়।
ব্রহ্মপুত্র চর দ্বীপ বিজ্ঞানভিত্তিক নীতির এই পরিকল্পনাকে আরও শক্তিশালী করছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর সহায়তায় চলমান একটি প্রকল্প — ‘ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ব্রহ্মপুত্র ইন্টিগ্রেটেড ফ্লাড অ্যান্ড রিভারব্যাংক ইরোশন রিস্ক ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম’, যা বন্যা ও ভাঙনের বিরুদ্ধে অবকাঠামো তৈরি এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ চরবাসীদের জীবিকা উন্নয়নে কাজ করছে।
বরাক উপত্যকা ও বরাক নদীর সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতা
এই নীতি-উদ্যোগটি সরাসরি ব্রহ্মপুত্র নদীকেন্দ্রিক হলেও বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির জন্যও এটি তাৎপর্যহীন নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের একটি পরিকল্পনায় বরাক নদীকেও অভ্যন্তরীণ জলপথ উন্নয়নের আওতায় আনা হচ্ছে এবং ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে পান্ডু পর্যন্ত বরাক নদীতে ন্যূনতম ২.৫ মিটার নৌচলাচলযোগ্য গভীরতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। ব্রহ্মপুত্রে চর সংরক্ষণের জন্য যে জোনিং ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষার নীতিকাঠামো তৈরি হচ্ছে, ভবিষ্যতে বরাক নদীর চরাঞ্চলেও অনুরূপ পদ্ধতি অনুসরণ করার দাবি উঠতে পারে।
লালা ও হাইলাকান্দির বাসিন্দারা জানেন যে বরাক নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোও প্রতিবছর বন্যা ও ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্রহ্মপুত্রে চরের মানুষদের জন্য যে বিজ্ঞানভিত্তিক সুরক্ষানীতি আসছে, সেই একই দৃষ্টিভঙ্গি বরাক উপত্যকার নদীতীরবর্তী জনপদের জন্যও প্রয়োজন — যেখানে নদীর প্রকৃতি বুঝে সেই মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, শুধু প্রতিক্রিয়াশীল ত্রাণ নয়।
পরবর্তী পদক্ষেপ: চূড়ান্ত নীতি কবে?
পরামর্শমূলক বৈঠকের পর এখন বিভিন্ন সরকারি দপ্তর তাদের মতামত পাঠাবে ব্রহ্মপুত্র বোর্ডের কাছে। সব পক্ষের মতামত পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত খসড়া নীতি তৈরি করা হবে এবং সেটি অনুমোদনের জন্য রাজ্য সরকারের কাছে পেশ করা হবে। চরাঞ্চলের মানুষদের জীবন ও জীবিকা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য — এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় রেখে একটি সমন্বিত নীতি তৈরি করা কতটা কার্যকর হবে, সেটি নির্ভর করবে চূড়ান্ত নীতিতে কতটা প্রকৃত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে জায়গা দেওয়া হয় তার উপর। অসমের নদীচর নীতির এই যাত্রা উত্তর-পূর্ব ভারতের নদী ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে — যদি বাস্তবায়নে বিজ্ঞান ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি একসঙ্গে চলে।