ভারতে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি আবারও সাধারণ মানুষের বাজেটে চাপ বাড়াল। শনিবার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম তৃতীয়বারের মতো বাড়ানো হয়েছে, আর গত ১০ দিনে মোট বৃদ্ধি প্রায় ৫ টাকা প্রতি লিটারে পৌঁছেছে। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দামের ঊর্ধ্বগতিকে এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পেট্রোলের দাম দিল্লিতে ৮৭ পয়সা বেড়ে ৯৯.৫১ টাকা প্রতি লিটার হয়েছে, আর ডিজেল ৯১ পয়সা বেড়ে ৯২.৪৯ টাকা প্রতি লিটার হয়েছে। কলকাতায় পেট্রোল ৯৪ পয়সা বেড়ে ১১০.৬৪ টাকা এবং ডিজেল ৯৫ পয়সা বেড়ে ৯৭.০২ টাকা হয়েছে। মুম্বাই ও চেন্নাইয়েও একই হারে দাম বেড়েছে, যদিও রাজ্যভেদে করের পার্থক্যের কারণে চূড়ান্ত দামে কিছুটা তারতম্য দেখা গেছে।
তিন দফা হাইক, কারণ বিশ্ববাজার
এই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি একদিনের ঘটনা নয়। ১৫ মে পেট্রোল-ডিজেলের দাম একবার বাড়ানো হয়েছিল, ১৯ মে আবারও বৃদ্ধি হয়েছিল, আর ২৩ মে তৃতীয় দফা সংশোধন কার্যকর হয়। গত দুই দফায় আগে প্রায় ৩ টাকা এবং পরে আরও প্রায় ৯০ পয়সা করে দাম বেড়েছিল। ফলে মোট বৃদ্ধি ১০ দিনের মধ্যে প্রায় ৫ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব ভারতের খুচরা জ্বালানি বাজারে পড়ে। পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা, সরবরাহে উদ্বেগ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি করিডরকে ঘিরে ঝুঁকি এই সময়ে দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। ধাপে দামের বৃদ্ধি মূলত বৈশ্বিক শক্তি মূল্যচাপের প্রতিফলন।
তবে বিষয়টি শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতির নয়। খুচরা জ্বালানি দামের ওঠানামা সরাসরি পরিবহন, কৃষি, খাদ্য সরবরাহ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। বাসভাড়া, মালবাহী গাড়ির খরচ এবং শেষ পর্যন্ত বাজারদর বেড়ে যায়। ফলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ধীরে ধীরে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে।
বাজারে প্রভাব, শহর থেকে গ্রাম
এই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি শহরাঞ্চলে যেমন চাপ তৈরি করে, গ্রামীণ অঞ্চলে তার প্রভাব আরও বড় হয়ে দেখা দেয়। পণ্যবাহী ট্রাক, ছোট ব্যবসা, ডেলিভারি পরিষেবা, কৃষি-সংক্রান্ত পরিবহন—সবকিছুতেই খরচ বাড়ে। ইন্ধনের দামের সঙ্গে খাদ্যপণ্য, রান্নার সামগ্রী, নির্মাণসামগ্রী এবং দৈনন্দিন পরিষেবার মূল্যও সামঞ্জস্য রেখে ওপরে ওঠে।
আসামের মতো রাজ্যে, যেখানে সড়ক পরিবহন অনেকাংশে জ্বালানিনির্ভর, সেখানে এই বৃদ্ধি আরও দ্রুত অনুভূত হয়। গুয়াহাটি, শিলচর, হাইলাকান্দি বা লালা টাউনের মতো জায়গায় ছোট যানবাহন, অটোরিকশা এবং পণ্যবাহী গাড়ির চলাচল ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব স্থানীয় বাজারে পৌঁছাতেই সময় লাগে না। লালাবাজারের দোকানদার, পরিবহনকর্মী এবং দৈনন্দিন যাত্রীদের জন্য এমন জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি মানে মাসের শেষে খরচের তালিকা আরও দীর্ঘ হওয়া।
এখানে আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার—জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির খরচ বাড়ে না, স্কুলবাস, অ্যাম্বুলেন্স, সব্জি পরিবহন এবং গ্রামীণ সরবরাহ শৃঙ্খলেও চাপ পড়ে। ফলে এটি একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ইস্যু, যা নিম্ন আয়ের পরিবারকে দ্রুত আঘাত করতে পারে।
শহরভেদে দামের পার্থক্য
ভারতে পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা দাম কেন্দ্রীয়ভাবে একরকম নয়। রাজ্যভিত্তিক VAT, পরিবহন খরচ, ডিলার কমিশন এবং স্থানীয় করের কারণে শহরভেদে দাম আলাদা হয়। তাই দিল্লির দামের সঙ্গে কলকাতা, মুম্বাই বা চেন্নাইয়ের পার্থক্য দেখা স্বাভাবিক। দিল্লিতে পেট্রোল ৯৯.৫১ টাকা ও ডিজেল ৯২.৪৯ টাকা, আর কলকাতায় পেট্রোল ১১০.৬৪ টাকা ও ডিজেল ৯৭.০২ টাকা।
এই পার্থক্যই দেখায় যে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি-র জাতীয় প্রভাব থাকলেও স্থানীয় স্তরে তার হিসাব আলাদা। উত্তর-পূর্বের পরিবহননির্ভর বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে মাল পরিবহনের খরচও তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হতে পারে। তাই এক জায়গার দামের সংখ্যাই আসল ছবি নয়; বরং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর তার প্রভাব দেখা জরুরি।
আগামী দিনে কী হতে পারে
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ কতদিন থাকবে এবং তেল বিপণন সংস্থাগুলি কতটা দফায় দফায় দাম সংশোধন করবে। যদি পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি আরও কিছুদিন চলতে পারে। আর তা হলে পরিবহন, উৎপাদন ও খুচরা বাজার—সবখানেই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, সরকার বা তেল সংস্থাগুলি যদি বাজার স্থিতিশীল রাখতে কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে এই দামের অভিঘাত কিছুটা কমতে পারে। তবে আপাতত ১০ দিনের মধ্যে প্রায় ৫ টাকা বৃদ্ধির পর ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ স্পষ্ট। তাই আগামী কয়েকদিনে আন্তর্জাতিক তেলের দাম, সরকারী নীতি এবং খুচরা বাজারের প্রতিক্রিয়া—এই তিনটিই নজরে রাখার মতো বিষয়।