আসামে ইউসিসি বিল ২০২৬ নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনা এখন জোরদার হয়ে উঠেছে। ২৫ মে, ২০২৬ তারিখে অসম বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা‑এর হয়ে সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী অতুল বোরা পেশ করেছেন ‘দ্য ইউনিফর্ম সিভিল কোড, অসম, ২০২৬ বিল’। এই আইন বিষয়ক খসড়া ইউসিসি বিল আসামে বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ এবং লিভ‑ইন সম্পর্ক সংক্রান্ত বিষয়গুলিতে সব ধর্মাবলম্বীদের জন্য একই দেওয়ানি কাঠামো তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে এসেছে। আসাম রাজ্য মন্ত্রিসভা ইতিমধ্যেই এই বিলের খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছে এবং এখন থেকে বিধানসভায় এটি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
আসামে ইউসিসি বিল ২০২৬ এর মূল বৈশিষ্ট্য
আসামে ইউসিসি বিল ২০২৬ প্রস্তাবের অন্যতম লক্ষ্য হল ধর্মীয় ভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে সব ধর্মের জন্য একই নাগরিক আইন প্রয়োগ করা। বিলটিতে এক ব্যক্তির পক্ষে একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা রয়েছে; অর্থাৎ পলিগামি বা বহুবিবাহ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হবে। বিবাহের ন্যূনতম বয়স পুরুষের জন্য ২১ বছর এবং নারীর জন্য ১৮ বছর নির্ধারিত করার প্রস্তাবও এই বিলে রয়েছে। এছাড়াও বিবাহ ও তালাক উভয়ের বাধ্যতামূলক নথিভুক্তকরণ (registration) এবং তার জন্য বিশেষ রেজিস্ট্রার নিয়োগের কথাও উঠেছে।
বিশেষ করে লিভ‑ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রটি এখন পর্যন্ত আসামে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়নি; তবে এই বিলটি লিভ‑ইন সম্পর্ক প্রথমবারের মতো বৈধানিক কাঠামোর আওতায় আনতে চায়। বিলটি লিভ‑ইন সম্পর্ক নিবন্ধনকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করে এবং তাদের জন্য আলাদা রেজিস্ট্রার নিয়োগের প্রস্তাবও দেয়, যাতে লিভ‑ইন দম্পতি ও তাদের সন্তানদের আইনি অধিকার সুস্পষ্ট হয়। এতে লিভ‑ইন সম্পর্কে জন্মানো সন্তানদের সম্পত্তিতে অধিকার, মাতা–শিশুর সুরক্ষা এবং নারী ও শিশুদের অধিকার দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত হবে বলে সরকারের দাবি।
নারী অধিকার ও সামাজিক সমতার দাবি
সরকার বিল চালু করাকে নারী অধিকার ও সামাজিক সমতার লড়াইয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। বহুবিবাহ, তালাক‑প্রথা ও লিভ‑ইন সম্পর্কের অনিয়ন্ত্রিত চর্চা প্রায়ই নারী ও শিশুদের অবহেলায় পরিণত হয়। এই সব অন্যায় কমাতেই আসামে ইউসিসি বিল ২০২৬ এর মতো একটি কাঠামোগত আইন প্রয়োজন বলে মনে করা হয়। বিলের রচনায় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এর হয়ে লেখা “Statement of Object and Reasons”‑এ এও উল্লেখ করা হয়েছে যে এই নীতি সংবিধান অনুচ্ছেদ ৪৪‑এর নির্দেশক মূলনীতিগুলির ওপর ভিত্তি করে গঠিত, যেখানে সরকারকে একক দেওয়ানি কোডের দিকে এগোনোর কথা বলা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমগুলির একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন বিল নারীদের পরিবারের সম্পত্তিতে আইনি অধিকার প্রদান এবং তালাক ও পরিত্যাগ–সংক্রান্ত ক্ষেত্রে তাদের আইনগত সুরক্ষাকে দৃঢ় করার লক্ষ্য রাখে। একই সঙ্গে লিভ‑ইন সম্পর্কের মাধ্যমে জন্মানো সন্তানদের সম্পত্তি ও অন্যান্য আইনগত অধিকার স্বীকার করা হবে, যা ধর্মভিত্তিক বিচার ব্যবস্থায় অনেক সময় নজর এড়িয়ে যায়। সামাজিক ও আইনি বিশ্লেষকদের দল বলছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ আসামের নারী ও লিভ‑ইন দম্পতির স্বাধীনতায় সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যেতে পারে।
বিরোধিতা, চ্যালেঞ্জ ও ধর্মীয় ও জাতিগত রিয়েকশন
তবে এই বিল নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়া ও ন্যাশনাল ডেইলিগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কংগ্রেস, রাইজোর দল ও তৃণমূল কংগ্রেস–সহ বেশকিছু বিরোধী দল বিল পেশ করার পরপরই এর বিরুদ্ধে স্থান নেয়। তারা চাইছেন আরও বিস্তৃত পরামর্শ ও জনমত সংগ্রহ করে আইন পাস করা হোক, না হয় বিলের প্রক্রিয়াতে এগিয়ে যাওয়া হোক। বিরোধীরা বলছেন, ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের ওপর একটি রাজ্যভিত্তিক আইন চাপিয়ে দেওয়ার ফলে অনেক সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও আচরণে হস্তক্ষেপ হতে পারে।
একই সঙ্গে জাতিগত সংশয়ও উঠেছে। বার্টাম্যান পত্রিকা ও অন্য সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে যে বিলটি রাজ্যের অনুসূচিত জনজাতি (ST) সম্প্রদায়ের ওপর প্রযোজ্য হবে না, যারা রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ১২.৪৫ শতাংশ। এতে করে জাতিগত ও ধর্মীয় নেতারা একদিকে স্বস্তির দিক দেখছেন, অন্যদিকে কেউ কেউ এই ব্যবস্থাকে “অসম অসম পদক্ষেপ” বলে সমালোচনা করছেন। একজন স্থানীয় সামাজিক কর্মী বার্তা প্রকাশের প্রতিবেদনে বলেছেন, “এই বিল যদি সত্যিকারের আলোচনা ও কনসানসাসের মাধ্যমে এগোয়, তা হলে আসামের সামাজিক ও আইনি ঢাঞ্চাকে শক্তিশালী করতে পারে। নাহলে এটা রাজনৈতিক হুড়োহুড়ির ফলাফল হবে মাত্র।”
বারাক উপত্যকা, আসাম ও হাইলাকান্দি—লালা টাউনের প্রত্যাশা
আসামে ইউসিসি বিল ২০২৬ আলোচনার ঢেউ শুধু রাজধানী গুয়াহাটিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বারাক উপত্যকার হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ ও কাছাড় জেলাতেও এর চাপ অনুভূত হচ্ছে। হায়লা অঞ্চলগুলিতে অনেক দম্পতি এখন পর্যন্ত বিবাহ নিবন্ধন ছাড়াই সহবাস করেন বা কোরাল কিংবা পস্তি‑ভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করেন। এই অনিয়মিত চর্চা নারী ও শিশুদের আইনি অধিকার হরণ করে এমন যুক্তি এখন লালা টাউনের স্থানীয় সংস্কৃতিবিদদের মধ্যেও জোর পাচ্ছে।
একজন হাইলাকান্দি‑ভিত্তিক সামাজিক কর্মী বলেন, “আসামের যে সব অঞ্চলে জনবহুল ও শিক্ষার পরিসর বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে লিভ‑ইন সম্পর্ক ও অনিয়ন্ত্রিত বিবাহপ্রথা নিয়ে অনেকেই এখন চিন্তা করছেন। এই বিল যদি সঠিকভাবে কার্যকর হয়, তবে হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের দম্পতি ও তাদের সন্তানদের জন্য সম্পত্তি উত্তরাধিকার, শিক্ষা ও সুরক্ষা সংক্রান্ত অধিকার স্পষ্ট হবে।” স্থানীয় শিক্ষক মহলও মনে করেন, এই আইন স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীদের নাগরিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায় সম্পর্কে আলোচনা ও সেমিনার গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করবে।
ভবিষ্যতে আসামের পথচিহ্ন ও কী ঘটতে পারে
আসামে ইউসিসি বিল ২০২৬ এখন শুধু একটি খসড়া বা সরকারি প্রস্তাব নয়; এটি আসামের আইনি ও সামাজিক ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি পথচিহ্ন হিসেবেও গণ্য করা হচ্ছে। অসম হচ্ছে উত্তরাখণ্ড ও গুজরাতের পর তৃতীয় রাজ্য যেখানে UCC আইনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার স্তরে দীর্ঘদিন ধরে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে আলোচনা চলছে; এই পরিপ্রেক্ষিতে আসামের পদক্ষেপ নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি করেছে।
আগামী বার বিধানসভা অধিবেশনে বিলটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও ভোটের প্রক্রিয়া চলবে। বিধি পাস হলে তা সরাসরি বাস্তবে কার্যকর হবে; নাহলে খসড়া অবস্থাতেই থেমে যেতে পারে। যাই হোক, আসামে ইউসিসি বিল ২০২৬ বিতর্ক তৈরি করেছে এবং এর সঙ্গেই ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইন, নারী অধিকার, লিভ‑ইন সম্পর্ক ও জাতিগত নিরাপত্তা—এই সমস্ত বিষয়ে সমাজ জুড়ে সংলাপ বৃদ্ধি পাবে। এই চেতনা উঠলে লালা টাউন থেকে শুরু করে আসামের প্রতি কোণে নাগরিকদের আইনগত ও সামাজিক অধিকার সম্পর্কে আরও সচেতনতা তৈরি হবে।