অসম বিধানসভা মহিলা সংরক্ষণ ইস্যুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিল। ২০২৬ সালের ২৫ মে গুয়াহাটি-স্থিত বিধানসভায় একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়, যেখানে সংসদ ও রাজ্যের বিধানসভাগুলিতে ৩৩ শতাংশ নারী সংরক্ষণ কার্যকর করার পক্ষে সমর্থন জানানো হয়। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে কেন্দ্রের ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বাস্তবায়নের দাবিকে আরও জোরদার করা হয়েছে। শাসক ও বিরোধী—উভয় পক্ষই মূলত নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়।
৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ বিল: কী বলছে প্রস্তাব
বিধানসভায় গৃহীত প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে বলা হয় যে, সংসদ ও রাজ্য বিধানসভায় নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলবে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই প্রস্তাবের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, “নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল একটি সামাজিক প্রয়োজন নয়, এটি উন্নয়নের পূর্বশর্ত।” তাঁর মতে, নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া নীতি নির্ধারণের প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এই প্রস্তাবটি মূলত ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় সংসদে পাশ হওয়া নারী সংরক্ষণ আইনের বাস্তব প্রয়োগকে ত্বরান্বিত করার বার্তা বহন করে। যদিও ওই আইন কার্যকর করার জন্য জনগণনার পর সীমানা পুনর্নির্ধারণের (delimitation) প্রয়োজন রয়েছে, তবুও রাজ্যগুলির সমর্থন এই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও জাতীয় প্রেক্ষাপট
অসমের এই পদক্ষেপকে জাতীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যম— রাজ্য ইতিমধ্যে এই সংরক্ষণ বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্য বিধানসভাগুলির এই ধরনের প্রস্তাব কেন্দ্রের ওপর দ্রুত বাস্তবায়নের চাপ তৈরি করতে পারে।
বিরোধী দলগুলিও মূলত প্রস্তাবের বিরোধিতা করেনি, তবে তারা দ্রুত বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এক বিরোধী বিধায়ক বলেন, “আইন পাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে তা কবে কার্যকর হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।” এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকলেও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে।
অসম ও বরাক উপত্যকার প্রেক্ষাপট
অসম বিধানসভা মহিলা সংরক্ষণ প্রস্তাবটি বরাক উপত্যকার মতো অঞ্চলের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের মতো এলাকায় নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে এখনও সীমিত। স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলির মতে, সংরক্ষণ কার্যকর হলে গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকার মহিলারা আরও বেশি করে নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নিতে উৎসাহিত হবেন।
লালা টাউনের এক সমাজকর্মী জানান, “নারীদের জন্য নির্দিষ্ট আসন থাকলে অনেক নতুন মুখ সামনে আসবে, যা স্থানীয় উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।” বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পে নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
ভারতের বর্তমান লোকসভায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি, যা এখনও অনেক উন্নত দেশের তুলনায় কম। এই প্রেক্ষাপটে ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর হলে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে নীতি নির্ধারণে বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক বিষয়গুলিতে আরও সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।
অসম বিধানসভা মহিলা সংরক্ষণ প্রস্তাব তাই কেবল একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে অন্যান্য রাজ্যগুলিকেও একই পথে হাঁটার জন্য উৎসাহিত করতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই প্রস্তাবটি নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে কেন্দ্রীয় স্তরে এই আইন কার্যকর করার সময়সীমা ও বাস্তব প্রভাবের দিকে।