আসাম বিধানসভায় কর্মী ছাঁটাইয়ের বড় পদক্ষেপ নিলেন নবনির্বাচিত স্পিকার রঞ্জিৎ কুমার দাস। ২৯ মে ২০২৬ তারিখে আসাম বিধানসভা সচিবালয়ের এক আনুষ্ঠানিক আদেশে ১২ জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে তাঁদের চুক্তিভিত্তিক পুনর্নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে বিধানসভা সচিবালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোয় ব্যাপক পুনর্গঠনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে । এর আগে ২৭ মে বিধানসভার সচিব দুলাল পেগুকেও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, যিনি অবসরের পরও চুক্তিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন ।
বরখাস্ত হওয়া কর্মীরা কারা?
আসাম বিধানসভা সচিবালয়ের আদেশ অনুযায়ী, যে ১২ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রঞ্জিৎ কুমার শর্মা, পঙ্কজ কুমার শর্মা, ধনঞ্জিৎ তালুকদার, তরুণীকান্ত স্বর্গীয়ারি, সেওয়ালি দেবী, কবিরাম হালোই, কুলধর কামান, সমীর দাস, মাধব তালুকদার, ভবেন পেগু, বিশ্বজিৎ শোম এবং দিলীরাম শর্মা । এঁরা সকলেই অবসর গ্রহণের পর চুক্তিভিত্তিক পুনর্নিয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন।
বরখাস্ত হওয়া কর্মীরা বিধানসভার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় কর্মরত ছিলেন — পাবলিক আন্ডারটেকিং কমিটি, MLA হোস্টেল, ইস্যু ব্রাঞ্চ, লেজিসলেশন ব্রাঞ্চ, এস্টাব্লিশমেন্ট ব্রাঞ্চ, সিকিউরিটি ব্রাঞ্চ এবং CPA ব্রাঞ্চে তাঁরা OSD, সমন্বয়কারী, অফিস সহকারী, দরোয়ান ও সাপোর্ট স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন । স্পিকারের নির্দেশে জারি হওয়া এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।
নিয়োগ অনিয়মের অভিযোগ ও আদালতে PIL
আসাম বিধানসভায় কর্মী ছাঁটাইয়ের এই সিদ্ধান্তের পটভূমিতে রয়েছে বিধানসভা সচিবালয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ। সম্প্রতি অল আসাম আনএমপ্লয়েড অ্যাসোসিয়েশন (AAUA) গৌহাটি হাইকোর্টে একটি Public Interest Litigation (PIL) দায়ের করে। ওই PIL-এ দাবি করা হয় যে সচিবালয়ে প্রায় ৫০টি নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে কোনো পাবলিক বিজ্ঞাপন বা স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া ছাড়াই ।
PIL-এ আরও বলা হয়, গ্রেড III ও গ্রেড IV পদে প্রায় ৩৪ জন প্রার্থীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং পরে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি সত্ত্বেও তাঁদের নিয়মিত করা হয়েছে। প্রাক্তন স্পিকার বিশ্বজিৎ দৈমারির আমলে কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বারবার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করার অভিযোগও রয়েছে এই আবেদনে। বিশেষত প্রাক্তন সচিব দুলাল পেগুকে নির্ধারিত অবসরের বয়সের পরও কর্মরত রাখার বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়েছে ।
স্পিকার রঞ্জিৎ কুমার দাস: নতুন নেতৃত্বে পরিবর্তনের বার্তা
রঞ্জিৎ কুমার দাস চলতি মাসে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে আসাম বিধানসভার স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন । দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি একের পর এক কড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রথমে ২৭ মে সচিব দুলাল পেগুকে সরিয়ে দিয়ে রাজিব ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তারপর ২৯ মে আরও ১২ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মীকে অব্যাহতি দেওয়া হয় ।
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত কিছু তথ্য অনুযায়ী, মোট ২৯ জন কর্মীকে পদ থেকে সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । যদিও সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক নথিতে ১২ জনের নাম উল্লেখ আছে, বাকি পদক্ষেপগুলো পর্যায়ক্রমে কার্যকর হচ্ছে বলে জানা গেছে। কর্তৃপক্ষ এখনও স্পষ্টভাবে জানায়নি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত চালানো হবে কি না ।
আসাম ও বরাক উপত্যকার প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব
আসাম বিধানসভায় এই প্রশাসনিক রদবদল রাজ্যের প্রতিটি কোণের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হাইলাকান্দি ও লালা অঞ্চলের বহু শিক্ষিত বেকার যুবক সরকারি চাকরির জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন। বিধানসভা সচিবালয়ে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি স্পষ্ট করে যে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানেও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। AAUA-এর মতো সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় বেকার যুবকদের অধিকার নিয়ে লড়াই করছে এবং এই PIL তার ধারাবাহিকতারই অংশ ।
সামনের দিকে কী অপেক্ষা করছে?
স্পিকার রঞ্জিৎ কুমার দাসের এই সিদ্ধান্তগুলো আসাম বিধানসভা সচিবালয়ে একটি বড় প্রশাসনিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গৌহাটি হাইকোর্টে দায়ের হওয়া PIL-এর শুনানির গতিপ্রকৃতির উপর নজর রাখা দরকার — কারণ সেই মামলার রায় ভবিষ্যতে বিধানসভায় নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হবে তা নির্ধারণ করবে। অব্যাহতি পাওয়া কর্মীরা কোনো আইনি পদক্ষেপ নেবেন কি না, সেটিও দেখার বিষয়। সর্বোপরি, রাজ্যের বিধানসভা সচিবালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা চুক্তিভিত্তিক পুনর্নিয়োগের সংস্কৃতি ভাঙতে স্পিকার দাস কতটা দৃঢ় থাকেন — সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।