গুয়াহাটি, শিলচর ও ডিব্রুগড় — অসমের এই তিনটি প্রধান শহর এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (ADB) সহায়তায় বড় মাপের উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ADB অসম উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ভারত সরকার ও ADB ইতিমধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মধ্যে নগর পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য ১২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্রে আরও প্রায় ৩৯৯ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রয়েছে। এই বিনিয়োগের সুফল পাবেন অসমের কয়েক লক্ষ মানুষ, এবং বিশেষভাবে বরাক উপত্যকার বাসিন্দারাও এই উন্নয়নের অংশীদার হতে চলেছেন।
ADB অসম উন্নয়ন প্রকল্প: নগর পরিকাঠামোয় বিশাল পরিবর্তন
গত বছর সেপ্টেম্বরে ভারত সরকার এবং ADB একটি ঐতিহাসিক ১২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা ‘অসম আরবান সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ (AUSDP) নামে পরিচিত। এই চুক্তিতে ভারতের পক্ষে স্বাক্ষর করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্সের যুগ্মসচিব সুহি মুখার্জি এবং ADB-র পক্ষে স্বাক্ষর করেন ভারতে ADB-র কান্ট্রি ডিরেক্টর মিও ওকা। এই প্রকল্পের আওতায় অসমের বরপেটা, বঙাইগাঁও, ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, গোলাঘাট এবং নলবাড়ি — এই ছয়টি জেলা সদরে পানীয় জলের অবকাঠামো নির্মাণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। মোট ছয়টি জল শোধনাগার নির্মিত হবে, যার মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা হবে প্রতিদিন ৭২ মিলিয়ন লিটার। পাশাপাশি ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিতরণ পাইপলাইন স্থাপন করা হবে।
গুয়াহাটিতে এই প্রকল্পের আওতায় বহিনী বেসিন এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বন্যা প্রতিরোধক খাল, উন্নত নর্দমা ব্যবস্থা এবং প্রকৃতি-ভিত্তিক জলধারণ পুকুর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা একদিকে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমাবে এবং অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণেও সহায়তা করবে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি অসমের মোট ৩ লক্ষ ৬০ হাজার বাসিন্দার জীবনযাত্রার মান সরাসরি উন্নত করবে। নগর পরিচালনার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসছে — GIS-ভিত্তিক সম্পত্তি কর ডেটাবেস, ডিজিটাল জল বিলিং ব্যবস্থা এবং অ-রাজস্ব জলের অনুপাত ২০ শতাংশের নিচে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিলচর ও ডিব্রুগড়ে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়ন
নগর পরিকাঠামোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও ADB অসমে বড় বিনিয়োগ করছে। ‘অসম স্টেট টার্শিয়ারি হেলথ কেয়ার অগমেন্টেশন প্রজেক্ট’ (ASTHA) শিরোনামে একটি পৃথক প্রকল্পে ADB প্রায় ৩৯৮.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় গুয়াহাটি, ডিব্রুগড় এবং শিলচরের মেডিকেল কলেজগুলিকে আধুনিকীকরণ করা হবে। এই তিনটি মেডিকেল কলেজকে শ্রীমন্ত শংকরদেব বিশ্ববিদ্যালয় অব হেলথ সায়েন্সেস-এর অধীনে ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগ অসমের সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবায় দীর্ঘদিনের ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
শিলচর মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল (SMCH) হলো বরাক উপত্যকা তথা দক্ষিণ অসমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। ASTHA প্রকল্পের আওতায় এই প্রতিষ্ঠানের আধুনিকীকরণ শুধু শিলচর শহরের নয়, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ ও বরাক উপত্যকার সব জেলার বাসিন্দাদের জন্যই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। লালা শহর ও হাইলাকান্দি জেলার রোগীরা বহুদিন ধরে জটিল চিকিৎসার জন্য শিলচরের উপর নির্ভর করেন — এই প্রকল্প সেই নির্ভরতাকে আরও নির্ভরযোগ্য ও মানসম্পন্ন করে তুলবে।
মহিলা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্ব
এই প্রকল্পের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও মহিলাদের ক্ষমতায়নে বিশেষ মনোযোগ। মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে জল পরিচালনার কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তরুণী শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরি করা হবে এবং বিদ্যালয় স্তরে জল, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এছাড়াও, IIT গুয়াহাটির সহযোগিতায় ‘অসম স্টেট ইনস্টিটিউট ফর আরবান ডেভেলপমেন্ট’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে, যা রাজ্যের নগর পরিকল্পনা ও প্রশাসনে দীর্ঘমেয়াদী দক্ষতা তৈরিতে সহায়তা করবে। এই উদ্যোগগুলি প্রমাণ করে যে, ADB-র এই বিনিয়োগ কেবল ইট-পাথরের পরিকাঠামো নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নেও সমানভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভবিষ্যতের পথ: অসমের নগরায়ণ নতুন গতিতে
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন যে ডিব্রুগড়কে অসমের দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হবে এবং শিলচরে একটি নতুন সচিবালয় ও মুখ্যসচিবের কার্যালয় স্থাপন করা হবে, যা বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মধ্যে প্রশাসনিক সেতুবন্ধন নিশ্চিত করবে। এই রাজনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে ADB-র নগর ও স্বাস্থ্য বিনিয়োগ একসূত্রে গেঁথে অসমের তিনটি প্রধান শহরকে সত্যিকারের আধুনিক নগরকেন্দ্রে রূপান্তরিত করার পথ খুলে দিচ্ছে। তবে এই সুবিশাল প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন নির্ভর করবে প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং সময়মতো কাজ সম্পাদনের উপর। অসমের নাগরিক সমাজ ও সুশীল সমাজ স্বাভাবিকভাবেই চাইবেন যে এই কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাক — কাগজে-কলমে পরিকল্পনার বাইরে বেরিয়ে বাস্তবের মাটিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনুক।