২১ জুন ২০২৬ তারিখে আসামের ডিমা হাসাও জেলার জাতিঙ্গা এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধসের কারণে জাতিঙ্গা-শিলচর জাতীয় মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। টানা বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে সড়কের উপর এসে পড়ে, যার ফলে সকাল থেকেই শত শত যানবাহন উভয় দিক থেকে আটকা পড়ে। এই ডিমা হাসাও ভূমিধস শুধু যাত্রীদের নয়, পণ্যবাহী যানবাহনের চালক ও ব্যবসায়ীদের জন্যও বড় সমস্যা তৈরি করেছে।
ভূমিধসের ঘটনাটি ঘটে সকালের দিকে এবং মুহূর্তের মধ্যে রাস্তা জুড়ে মাটি ও পাথরের স্তূপ জমে যায়। ইটিভি ভারতের অসমিয়া প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হাফলং-শিলচর জাতীয় মহাসড়কে এই ধস সংঘটিত হওয়ার পর প্রশাসন রাস্তা পরিষ্কার করার কাজ শুরু করে, তবে রাত পর্যন্ত সংযোগ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার প্রভাব ও যাত্রীদের দুর্ভোগ
জাতিঙ্গা-শিলচর মহাসড়কটি ডিমা হাসাও জেলাকে বরাক উপত্যকার সঙ্গে সংযুক্ত করে এবং এই পথে প্রতিদিন শত শত যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করে। ধসের কারণে সড়কের দুই দিকে যানজটের সৃষ্টি হয়, যাত্রীরা রাস্তার উপরেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। পচনশীল পণ্য নিয়ে আসা ট্রাকচালকরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এই সড়কটি কেবল দৈনন্দিন যাতায়াতের পথ নয়, বরাক উপত্যকার জন্য এটি একটি জীবনরেখা। শিলচর, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জ থেকে আসা যাত্রীরা এই পথ ধরেই রাজ্যের অন্যান্য অংশ এবং উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন রাজ্যে যাতায়াত করেন। ভূমিধসে এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে পুরো বরাক উপত্যকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, যা বারবার অতীতেও ঘটেছে।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির উপর প্রভাব
বরাক উপত্যকার সঙ্গে রাজ্যের বাকি অংশের সড়ক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এই অঞ্চলের মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়। প্রতি বছর মৌসুমি বর্ষার সময় ডিমা হাসাওয়ের পার্বত্য পথে ভূমিধস ও রাস্তা বন্ধের ঘটনা ঘটে, যা শিলচর, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জের মানুষকে মাঝে মাঝে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের ধসের সময় NH-6 বন্ধ থাকলে বরাক উপত্যকা, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং মণিপুরের কিছু অংশের সঙ্গেও সড়ক সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হাইলাকান্দি জেলার লালা টাউনের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরাও এই ধরনের সড়ক বিচ্ছিন্নতার সরাসরি শিকার হন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ, ওষুধ ও জ্বালানি পরিবহনে দেরি হয় এবং বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় রাস্তা বন্ধ থাকলে শিলচরের হাসপাতালে যাওয়ার পথও দুরূহ হয়ে ওঠে, যা অনেক পরিবারের জন্য উদ্বেগের কারণ।
বারবার ধসের ইতিহাস ও দুর্যোগ-প্রবণ অঞ্চলের বাস্তবতা
ডিমা হাসাও জেলা ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অঞ্চল। ২০২২ সালের মে মাসে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে জেলায় পাঁচ হাজারেরও বেশি ভূমিধস রেকর্ড করা হয়েছিল বলে ইস্ট মোজো জানিয়েছে, যা এই পাহাড়ি জেলার ভূমি ধসের প্রবণতা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দেয়। সেই বছর হাফলং থেকে শিলচর পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ২০২৫ সালের জুন মাসেও একই জাতিঙ্গা-লাম্পুর সেকশনে ধসে ট্রেন পরিষেবা বন্ধ ও মহাসড়ক অবরুদ্ধ হয়েছিল, এবং দিমা হাসাও জেলা প্রশাসন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৫-এর ৩৪(সি) ধারায় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
এপ্রিল ২০২৬-এও একই ডালাইচাং এলাকায় ধসের ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে দিনের মধ্যে দু’বার মাটি ও গাছ রাস্তার উপর পড়ে যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল। এই পুনরাবৃত্তিমূলক ঘটনাগুলি স্পষ্ট করে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে এই অঞ্চলে স্থায়ী অবকাঠামো এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা কতটা জরুরি।
প্রশাসনের তৎপরতা ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
সর্বশেষ ধসের পরে স্থানীয় প্রশাসন ও জাতীয় মহাসড়ক কর্তৃপক্ষ দ্রুত ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে। যানবাহন চালকদের পরিস্থিতি সম্পর্কে আপডেট রাখতে এবং সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে বলা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসবে না — পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করতে এবং সড়ক প্রকৌশলে আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে।
মৌসুমি বর্ষার মাঝে এই ডিমা হাসাও ভূমিধসের ঘটনা আরও একবার মনে করিয়ে দিল যে উত্তর-পূর্ব ভারতের পার্বত্য যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা কতটা গভীর। বরাক উপত্যকার সঙ্গে দেশের বাকি অংশের নিরবচ্ছিন্ন সড়ক সংযোগ নিশ্চিত করতে সরকারি পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা আজ আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।