আসামের রাজ্যপাল লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য রবিবার ১০ মে ২০২৬ মুখ্যমন্ত্রী-নির্বাচিত হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। রাজ্যপালের আমন্ত্রণে হিমন্ত আসাম সরকার গঠনের এই প্রক্রিয়া শুরু হয় সেই সন্ধ্যায়, যখন লোক ভবনে NDA জোটের নেতারা রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ১০২ জন বিধায়কের সমর্থনপত্র হস্তান্তর করেন। PTI সূত্রে প্রাপ্ত সরকারি বিবৃতিতে লোক ভবন জানিয়েছে, “রাজ্যপাল ডক্টর হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে আসামে নতুন সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।” ১২ মে ২০২৬ সকাল ১১টায় গুয়াহাটির খানাপাড়ায় ভেটেরিনারি ফিল্ডে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হবে — যেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
NDA নেতাদের রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও দাবি পেশ
১০ মে সকালে BJP বিধায়ক দলের বৈঠকে হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে সর্বসম্মতিক্রমে BJP বিধায়ক দলনেতা এবং পরে NDA জোটনেতা নির্বাচিত করা হয়। এরপর দুপুরে NDA জোটের প্রতিনিধিদল লোক ভবনে রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সরকার গঠনের দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করে। The Print-এর PTI প্রতিবেদনে প্রাক্তন BJP জাতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা সাংবাদিকদের জানান, “NDA নেতারা সরকার গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তিনটি জোটশরিক দলের স্বাক্ষরিত আবেদন রাজ্যপালকে দেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও জানান, “আমরা ১০২ জন MLA-র সমর্থন রাজ্যপালকে প্রদান করেছি। আশা করি যথাযথ যাচাইয়ের পর তিনি হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন।” এরপর কিছু সময়ের মধ্যেই লোক ভবনের সরকারি বিবৃতিতে রাজ্যপালের আমন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়।
রাজ্যপাল লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য স্বয়ং শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন বলে Vartha Bharathi জানিয়েছে। এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদী ছাড়াও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, BJP-র নতুন জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীন এবং BJP-শাসিত ২০টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও আমন্ত্রিত। Deccan Herald ও Business Today-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা প্রস্তুতি পর্যালোচনায় আসামের মুখ্যসচিব রবি কোটা ইতিমধ্যেই DGP-র সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
হিমন্তর পদত্যাগ থেকে আমন্ত্রণ — সাংবিধানিক যাত্রাপথ
৬ মে হিমন্ত বিশ্বশর্মা মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন। রাজ্যপাল সেই পদত্যাগ গ্রহণ করে নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে অনুরোধ করেন। Business Today জানিয়েছে, শপথগ্রহণের তারিখ হিসেবে ১২ মে বেছে নেওয়ার বিশেষ কারণ সম্পর্কে হিমন্ত নিজেই জানিয়েছিলেন, “আমরা প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। কারণ এবার আমরা হ্যাটট্রিকের পাশাপাশি সেঞ্চুরিও পেয়েছি। PM-এর দফতর থেকে ইঙ্গিত ছিল যে ১১ মে-র পরে সম্ভব হবে।”
NDTV-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ মে হিমন্ত বিশ্বশর্মা আগেই জানিয়েছিলেন যে ১০ মে-র বৈঠকের পর NDA নেতারা দুপুর ১২টায় রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং রাজ্যপালের অনুমতি পাওয়ামাত্র সরকার গঠনের প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে শুরু হবে। সেই রোডম্যাপ অনুযায়ীই সবকিছু নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে। এই গোটা প্রক্রিয়া — BJP বিধায়ক দলের বৈঠক থেকে রাজ্যপালের আমন্ত্রণ পর্যন্ত — আসামের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি সুশৃঙ্খল ও দ্রুততম সরকার গঠন প্রক্রিয়ার উদাহরণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
আসাম NDA-র ঐতিহাসিক তৃতীয় মেয়াদ
রাজ্যপালের আমন্ত্রণে হিমন্ত আসাম সরকার গঠনের এই মুহূর্তটি কেবল একটি প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয় — এটি আসামের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। BJP নেতৃত্বাধীন NDA জোট — যার তিনটি প্রধান শরিক হলো BJP, অসম গণ পরিষদ (AGP) এবং বডোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট (BPF) — ২০১৬, ২০২১ ও ২০২৬ সালে পর পর তিনবার ক্ষমতায় আসছে। ২০২৬-এর নির্বাচনে ১২৬টির মধ্যে ১০২টি আসন জয় — এটি কার্যত একটি ব্যতিক্রমী নির্বাচনী সাফল্য।
হিমন্ত বিশ্বশর্মা নিজে প্রথমবার ২০২১ সালে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হন। এবার ২০২৬-এ তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য CM পদে শপথ নেবেন, কিন্তু পুরো NDA জোটের দৃষ্টিতে এটি টানা তৃতীয় মেয়াদের সরকার। এই তৃতীয় মেয়াদে মন্ত্রিসভার গঠন, বিভাগ বণ্টন এবং নতুন নীতি-কর্মসূচি কী হবে — সেটি নিয়ে রাজ্যের সকল মহলে প্রবল আগ্রহ।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রত্যাশা
রাজ্যপালের আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে আসামের তৃতীয় NDA সরকারের পথ সরকারিভাবে উন্মুক্ত হলো — এবং এই নিশ্চয়তা বরাক উপত্যকার মানুষের কাছেও নতুন প্রত্যাশা নিয়ে এসেছে। হাইলাকান্দি, কাছাড় ও করিমগঞ্জ জেলা — এই তিনটি জেলাই নতুন মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব পাবে কি না, সেই প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে আলোচিত। লালা সহ সমগ্র হাইলাকান্দি জেলায় বিদ্যুৎ পরিষেবার উন্নয়ন, রাস্তাঘাটের সংস্কার এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন — এই দাবিগুলি তৃতীয় মেয়াদে প্রতিফলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জেলাবাসীর মধ্যে প্রবল।
১২ মে-র শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে আসামের তৃতীয় NDA সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে। প্রধানমন্ত্রী মোদী ও কেন্দ্রের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে এই অনুষ্ঠান রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা পাঠাবে — আসাম BJP-র কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ়। শপথ নেওয়ার পর মন্ত্রিসভার তালিকা ও বিভাগ বণ্টন প্রকাশ পেলেই বোঝা যাবে তৃতীয় মেয়াদে বরাক উপত্যকার ভাগ্যে কী লেখা আছে।