আসামের সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বে CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মার করা একটি মন্তব্য এখন আইনি লড়াইয়ের দিকে মোড় নিচ্ছে। গুয়াহাটি সেন্ট্রাল কেন্দ্রের AJP প্রার্থী কুঙ্কি চৌধুরীর মা সুজাতা গুরুং চৌধুরী ইতিমধ্যে জাতীয় মহিলা কমিশন (NCW)-এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন। কুঙ্কি চৌধুরীর মা সুজাতার NCW অভিযোগে বলা হয়েছে, CM হিমন্ত শর্মা নির্বাচনী প্রচারের সময় তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা, মানহানিকর ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেছেন — এবং এর ফলে তিনি ভয়াবহ অনলাইন হেনস্থার শিকার হয়েছেন। সুজাতা এখন CM-এর বিরুদ্ধে মাত্র ₹১ ক্ষতিপূরণ চেয়ে একটি প্রতীকী মানহানি মামলার কথাও ভাবছেন।
প্রচারে কী বলেছিলেন CM হিমন্ত
৯ এপ্রিল বিধানসভা ভোটের আগে প্রচারে CM হিমন্ত শর্মা সাংবাদিকদের সামনে কুঙ্কি চৌধুরীর মা সুজাতা গুরুং চৌধুরীর একটি ছবি দেখান এবং দাবি করেন যে ওই ছবিতে সুজাতাকে প্রকাশ্যে গোমাংস খেতে দেখা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি তিনি আরও দাবি করেন, সুজাতার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট “সনাতনী মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছে,” তিনি পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতি পোষণ করেন এবং “দেশবিরোধী” ব্যক্তিদের সমর্থন করেন। CM হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন — “নির্বাচনের পরে আসাম ক্যাটল প্রিজার্ভেশন অ্যাক্ট, ২০২১ অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে” এবং তিনি বলেছিলেন — “গরুর মাংস খাওয়া আমি মানব না। আমি তাঁদের বিরুদ্ধে FIR করব।”
এই মন্তব্যের পরেই গুয়াহাটির সাইবার থানায় সুজাতার বিরুদ্ধে BNS, ২০২৩-এর আওতায় একটি FIR নথিভুক্ত হয় এবং তদন্ত শুরু হয়।
“ছবিটি কলোরাডোর একটি শিল্পকর্মের ছবি” — সুজাতার স্পষ্ট খণ্ডন
সুজাতার NCW অভিযোগের উদ্ধৃতি থেকে জানা যায়, তিনি স্পষ্টভাবে লিখেছেন — “মাননীয় CM সাংবাদিকদের সামনে যে ছবিটি দেখিয়েছেন, সেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো রাজ্যের ডেনভার শহরের The International Church of Cannabis-এ তোলা। ছবিতে যে বস্তুটি দেখা যাচ্ছে, সেটি একটি শঙ্কু-আকৃতির শিল্পকর্ম — কোনো খাদ্যসামগ্রী নয়।” তিনি আরও জানান — “গোমাংস খাওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর। এই দাবি আমার ব্যক্তিগত সম্মানের গভীর ক্ষতি করেছে।”
এই বিতর্কের পরেই কুঙ্কি চৌধুরী নিজেও গুয়াহাটি থানায় একটি পুলিশ অভিযোগ দায়ের করেন, অভিযোগ করেন যে তাঁর ও তাঁর পরিবারকে লক্ষ্য করে AI-তৈরি ডিপফেক ভিডিও তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো হচ্ছে।
NCW অভিযোগ ও মানহানি মামলার ভাবনা — পরবর্তী পদক্ষেপ কী
সুজাতা গুরুং চৌধুরী ১১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে NCW-তে তাঁর অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেছেন, CM-এর বক্তব্য “ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে হেয় করার এবং মেয়েকে রাজনৈতিকভাবে টার্গেট করার উদ্দেশ্যে” করা হয়েছিল। তিনি “ভুয়া প্রচারণার” জন্য CM-এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন। সুজাতা অভিযোগে আরও জানান যে তাঁর ও তাঁর নাবালক ছেলের ছবিও তাঁর সম্মতি ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো হয়েছে, যা একটি গুরুতর গোপনীয়তা লঙ্ঘন।
সুজাতা এখন CM-এর বিরুদ্ধে মাত্র ₹১ ক্ষতিপূরণ চেয়ে প্রতীকী মানহানি মামলার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছেন। ভারতীয় আইনে এই ধরনের ₹১-এর মানহানি মামলা মূলত আর্থিক প্রতিকারের জন্য নয় — এর মাধ্যমে মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে নৈতিক ও সামাজিক স্বীকৃতির দাবি জানানো হয়।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রাসঙ্গিকতা
এই বিতর্কটি বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির মানুষের কাছেও প্রাসঙ্গিক, কারণ এই অঞ্চলের সংখ্যালঘু ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে একটি সংবেদনশীল বিষয়। আসাম ক্যাটল প্রিজার্ভেশন অ্যাক্ট, ২০২১-এর প্রয়োগ এবং নির্বাচনী প্রচারে ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাসকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রশ্ন — এই দুটি বিষয় হাইলাকান্দি জেলা সহ গোটা বরাক উপত্যকায় নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এই বিতর্কের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন NCW-র দরজায়। জাতীয় মহিলা কমিশন অভিযোগটি গ্রহণ করে কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে পদক্ষেপ নেয়, এবং সুজাতা গুরুং চৌধুরী শেষ পর্যন্ত ₹১-এর মানহানি মামলাটি দায়ের করেন কি না — এই দুটি প্রশ্নের উত্তর অনেকে অপেক্ষায় থেকে দেখছেন। এই ঘটনা একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে ব্যক্তিগত আক্রমণের সীমা, ডিজিটাল হেনস্থার আইনি প্রতিকার এবং মহিলাদের মর্যাদা রক্ষায় NCW-র ভূমিকা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় আলোচনার সূচনা করেছে।