প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নরওয়েতে অনুষ্ঠিত ব্যবসা ও গবেষণা শীর্ষ সম্মেলনে ভারত-EFTA বিনিয়োগ চুক্তি-র আওতায় বিপুল বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের আহ্বান জানিয়েছেন। ১৯ মে ২০২৬-এ অসলোতে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, এই চুক্তি থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং ১০ লাখ নতুন চাকরি সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। নরওয়ের এই কর্মসূচি ভারতের ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সংযোগকে নতুন গতি দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
বিনিয়োগ, চাকরি ও নতুন বাজার
মোদির বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল—ভারত-EFTA বিনিয়োগ চুক্তি কেবল একটি কূটনৈতিক সমঝোতা নয়, বরং ভারতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় সুযোগ। EFTA দেশগুলির প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, পরিকাঠামো ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে শক্ত অবস্থান রয়েছে। সেই শক্তিকে ভারতের উৎপাদন, পরিষেবা, অবকাঠামো ও নতুন প্রজন্মের শিল্পে কাজে লাগানোর কথাই তিনি সামনে আনেন। ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ লক্ষ্য এবং ১০ লাখ চাকরির সম্ভাবনা এই চুক্তিকে অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংলাপ ও আগের সফর-সংক্রান্ত নথিগুলি দেখায়, এই সফরটি ইউরোপে ভারতের বৃহত্তর কৌশলগত উপস্থিতির অংশ। ভারত ও EFTA-এর মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্য-অর্থনৈতিক যোগাযোগ আরও গভীর হয়েছে, আর সেই পটভূমিতেই ভারত-EFTA বিনিয়োগ চুক্তি-কে বাস্তব বিনিয়োগে রূপান্তরের চাপ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এটি ভারতের জন্য শুধু বাজার সম্প্রসারণের নয়, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নেরও সুযোগ।
নরওয়ে সফরে কূটনৈতিক সাড়া
নরওয়ে সফরে মোদির কর্মসূচি শুধু ব্যবসা-কেন্দ্রিক ছিল না। তিনি নরওয়ের রাজনীতি ও অর্থনীতির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং ইউরোপে ভারতের ভাবমূর্তি আরও শক্ত করার চেষ্টা করেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অসলোতে তাঁর উপস্থিতি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ বিরতির পর উচ্চপর্যায়ের সংযোগকে নতুন করে সামনে এনেছে। এই সফরকে ৪৩ বছর পর ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রীর নরওয়ে সফর হিসেবেও দেখা হচ্ছে, যা রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
ব্যবসা ও গবেষণা শীর্ষ সম্মেলনে মোদির বক্তব্যে গবেষণা, উদ্ভাবন, সবুজ প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ শিল্পের কথাও উঠে এসেছে। নরওয়ের শক্তিশালী জাহাজ নির্মাণ, সামুদ্রিক প্রযুক্তি, জলবিদ্যুৎ এবং পরিবেশ-নির্ভর শিল্প ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত-EFTA বিনিয়োগ চুক্তি যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়, তাহলে প্রযুক্তিভিত্তিক বিনিয়োগ ও উচ্চমানের চাকরি সৃষ্টিতে নতুন দিগন্ত খুলতে পারে।
EFTA চুক্তির অর্থনৈতিক তাৎপর্য
EFTA জোটে নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং লিশটেনস্টাইন রয়েছে। ভারতের সঙ্গে এই গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের আলোচনার পর এখন নতুন গতি পেয়েছে। EFTA-র বাজার তুলনামূলক ছোট হলেও, এর প্রযুক্তি, উচ্চ-মানের উৎপাদন, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং টেকসই ব্যবসার মডেল ভারতীয় অর্থনীতির জন্য মূল্যবান। তাই ভারত-EFTA বিনিয়োগ চুক্তি শুধু শুল্ক বা বাণিজ্য নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দরজা খুলে দিতে পারে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি যদি সঠিক বাস্তবায়নের পথে এগোয়, তাহলে ভারতের কিছু নির্বাচিত খাতে বিদেশি মূলধন, দক্ষতা এবং রপ্তানি সুবিধা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে, যেসব ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করতে চায়, তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে। মোদির ১০০ বিলিয়ন ডলার ও ১০ লাখ চাকরির লক্ষ্যমাত্রা সেই প্রত্যাশাকেই রাজনৈতিক ভাষায় তুলে ধরেছে।
আসাম ও লালা টাউনের দৃষ্টিকোণ
এ খবর সরাসরি স্থানীয় না হলেও আসাম ও বরাক উপত্যকার মানুষের জন্য এর পরোক্ষ গুরুত্ব কম নয়। ভারত-EFTA বিনিয়োগ চুক্তি যদি প্রযুক্তি, খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ, পরিচ্ছন্ন শক্তি বা উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগ টানে, তাহলে আসামের মতো রাজ্যেও তার প্রভাব পৌঁছাতে পারে। হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ ও কাছাড়ে ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষি-ভিত্তিক উদ্যোগ এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। লালা টাউনের তরুণদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিদেশি বিনিয়োগ সাধারণত নতুন দক্ষতা, নতুন বাজার ও নতুন চাকরির পথ খুলে দেয়।
বরাক উপত্যকার অনেক ছোট উদ্যোক্তা ও যুব সমাজ এখন স্কিল-ভিত্তিক চাকরি এবং ছোট ব্যবসার নতুন সুযোগ খুঁজছেন। ভারত যদি ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারে, তবে সেই সুফল রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকাতেও পৌঁছাতে পারে। ভারত-EFTA বিনিয়োগ চুক্তি তাই কেবল দিল্লি-অসলো কূটনীতি নয়, বরং অসমের মানুষের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ভাবনার সঙ্গেও যুক্ত।
সামনে কী দেখার
এখন মূল প্রশ্ন, মোদির এই আহ্বান বাস্তবে কতটা দ্রুত বিনিয়োগে রূপ নেয়। ভারত-EFTA বিনিয়োগ চুক্তি ঘিরে ঘোষিত ১০০ বিলিয়ন ডলার ও ১০ লাখ চাকরির লক্ষ্যমাত্রা বড় হলেও, এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন, ব্যবসায়িক আস্থা, নিয়ন্ত্রক স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের ওপর। নরওয়ের বৈঠকগুলি সেই প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আগামী মাসগুলোতে এই চুক্তির অধীনে নতুন প্রকল্প, নতুন বিনিয়োগ ঘোষণা এবং শিল্প সহযোগিতার বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ পেলে বোঝা যাবে এই সফর কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে।