রঙালি বিহু এসেছে। ঢোলের বোল বেজেছে, পেঁপার সুর ছড়িয়েছে আসামের আকাশে। কিন্তু এবার বিহুর মঞ্চে একটা অভাব অনুভব করছেন আসামের লক্ষ লক্ষ মানুষ — জুবিন গার্গ বিহীন প্রথম বিহু উদযাপন হচ্ছে ২০২৬ সালে, এবং সেই অভাব পূরণ হওয়ার নয়। গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ সিঙ্গাপুরে নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়া ফেস্টিভালে পরিবেশন করতে গিয়ে মাত্র ৫২ বছর বয়সে ডুবে মারা যান অসমীয়া সংগীতের এই অবিসংবাদিত কণ্ঠ। সেই থেকে আসাম শোক বহন করছে — কিন্তু বিহুর মৌসুমে সেই শোক যেন আরও গভীর হয়েছে।
বিহুর মঞ্চ ছিল তাঁর ঘর
জুবিন গার্গের জন্য বিহু শুধু উৎসব ছিল না — এটি ছিল তাঁর অস্তিত্বের অংশ। বিগত দুই দশক ধরে, এপ্রিল এলেই আসামের গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত প্রতিটি বিহু মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি ছিল প্রায় অনিবার্য। হুসরি দলের কদম ধরে নাচানো হোক বা বড় শহরের বিহু মেলায় হাজার হাজার দর্শকের সামনে পরিবেশনা — জুবিন গার্গের কণ্ঠ বিহুকে একটি আলাদা আবেগের জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। The Sentinel-এর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, এ বছর উৎসব শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর পরিচিত কণ্ঠের অনুপস্থিতি মানুষের মনে একটা চাপা বেদনার মতো বসে আছে।
১৯৭২ সালের ১৮ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করা জুবিন গার্গ কেবল অসমীয়া ভাষার শিল্পী ছিলেন না। হিন্দি চলচ্চিত্র থেকে বাংলা গান, বোডো লোকসংগীত থেকে রাভা ভাষার সুর — তিনি আসামের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর হৃদয় ছুঁয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে গুয়াহাটির রাস্তায় যখন লক্ষাধিক মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বের হয়েছিলেন, তখন অনেকে ২০১১ সালে ভূপেন হাজারিকার শেষযাত্রার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। BBC বাংলার প্রতিবেদন জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় সম্মানে এবং ২১ বন্দুকের সালামের মধ্য দিয়ে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় গুয়াহাটিতে — যা তাঁর বিশালত্বের স্বীকৃতি।
সিঙ্গাপুরের আদালতের রায় ও আইনি বিতর্ক
জুবিন গার্গের মৃত্যুর পর মাসের পর মাস সন্দেহ ও রহস্যের মেঘ ঘিরে ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চে সিঙ্গাপুরের স্টেট করোনার আদাম নাখোদা তাঁর রায়ে জানান, এটি ছিল “একটি দুর্ভাগ্যজনক ও মর্মান্তিক ডুবে যাওয়ার ঘটনা।” NDTV-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিস্তারিত তদন্তে সিঙ্গাপুর পুলিশ কোস্ট গার্ড দেখতে পেয়েছে, লাজারুস দ্বীপের কাছে সমুদ্রে নামার সময় জুবিন জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেট পরতে অস্বীকার করেছিলেন। পরে তিনি জলের মধ্যে নিথর হয়ে যান এবং যাত্রাসঙ্গীরা তাঁকে নৌকায় তুলে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। টক্সিকোলজি রিপোর্টে দেখা গেছে, মৃত্যুর আগে রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা ছিল প্রতি ১০০ মিলিলিটারে ৩৩৩ মিলিগ্রাম — যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
সিঙ্গাপুরের আদালতের এই রায় ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে। তবে ভারতে — বিশেষত আসামে — বিষয়টি আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতায় জড়িয়ে গেছে। BBC-র প্রতিবেদন জানায়, আসামের মন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এটিকে “সরল ও সহজ খুন” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন, এবং আসাম পুলিশের Special Investigation Team জুবিনের ম্যানেজার-সহ বেশ কয়েকজনকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা সকলেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সিঙ্গাপুরের রায় এবং ভারতের আইনি কার্যক্রম — এই দুটি বিষয়ের মধ্যে বৈসাদৃশ্য এখনও মেটেনি।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দিতেও অনুরণিত শূন্যতা
জুবিন গার্গ কেবল ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার নয় — তিনি সমগ্র আসামের, সমগ্র উত্তর-পূর্বের। বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী মানুষের কাছেও তাঁর কণ্ঠ সমান আপন ছিল। হাইলাকান্দির লালা টাউন থেকে করিমগঞ্জ পর্যন্ত — বিহুর মৌসুমে তাঁর গান রেডিও, টেলিভিশন ও সামাজিক মাধ্যমে সমানভাবে ভেসে আসত। এ বছর বিহুর অনুষ্ঠানগুলোতে অনেক জায়গায় তাঁর গানকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হচ্ছে — কোনো কোনো সংগঠন তাঁর স্মৃতিতে বিশেষ পরিবেশনার আয়োজন করেছে। Sarakhon.com-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, “আসামের লক্ষো মানুষের কাছে ‘জুবিন-উত্তর’ পৃথিবী ভাবাই দুষ্কর।” এই অনুভূতি বরাক উপত্যকার মানুষেরও।
আসাম সরকার জুবিনের মৃত্যুর পর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছিল। কিন্তু প্রকৃত শোক তিন দিনে শেষ হওয়ার নয়। Sarakhon.com-এর মতে, গণ-শোকের এই শক্তি সমাজকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এবারের বিহুতে তাঁর গান যখন মাইকে বাজছে এবং মানুষ হঠাৎ থেমে যাচ্ছেন — সেই মুহূর্তটাই জুবিন গার্গের সত্যিকারের মাপকাঠি।
জুবিন গার্গ বিহীন এই প্রথম বিহু কেবল একটি উৎসবের বছর নয় — এটি একটি যুগের অবসানের পর নতুন করে নিজেকে খোঁজার মৌসুম। আসামের মানুষ তাঁর গানে ভেসেছেন, তাঁর সুরে পরিচয় খুঁজেছেন। সেই গান থেমে গেছে, কিন্তু তাঁর তৈরি সুর মুছে যাওয়ার নয়। আগামী বছরগুলোতে নতুন শিল্পীরা হয়তো বিহুর মঞ্চ ভরিয়ে দেবেন — কিন্তু যে শূন্যতা জুবিন রেখে গেছেন, তা পূরণ করার দাবি কেউ করেননি, কেউ করতে পারবেনও না।