১৩ এপ্রিল ২০২৬। এই তারিখটি ভারতের ইতিহাসে চিরকাল একটি মর্মান্তিক স্মৃতি বহন করে। ঠিক ১০৭ বছর আগে এই দিনে — ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল — পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী নিরীহ, নিরস্ত্র ভারতীয়দের উপর গুলি চালিয়ে শত শত মানুষকে হত্যা করেছিল। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের এই ১০৭তম বার্ষিকীতে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। জালিয়ানওয়ালাবাগ ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এই শহিদ দিবস পালন করেছে।
সেই রক্তাক্ত ১৩ এপ্রিল: ইতিহাসের ভয়াবহ অধ্যায়
১৩ এপ্রিল ১৯১৯ সাল ছিল বৈশাখী উৎসবের দিন। অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে হাজার হাজার মানুষ — পুরুষ, মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ — একত্র হয়েছিলেন উৎসব পালন করতে এবং নেতা ডাক্তার সৈফুদ্দিন কিচলু ও ডাক্তার সত্যপালের গ্রেফতারের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে। কিন্তু সে বছর ব্রিটিশ সরকার রাওলাট আইন জারি করেছিল — যে আইনে বিনা বিচারে ভারতীয়দের গ্রেফতার করার ক্ষমতা ছিল। সারা দেশে সেই আইনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল তুঙ্গে।
ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার সৈন্য নিয়ে জালিয়ানওয়ালাবাগে প্রবেশ করেন। Britannica-র বিবরণ অনুযায়ী, বাগানটির চারদিকে ভবন দিয়ে ঘেরা ছিল এবং বের হওয়ার পথ ছিল মাত্র একটি সরু গলি। ডায়ার কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা না দিয়েই সেই একমাত্র প্রবেশ-প্রস্থান পথ অবরুদ্ধ করে গুলির আদেশ দেন। Wikipedia-র তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দশ মিনিট ধরে গুলি চলে এবং মোট ১,৬৫০টি রাউন্ড গুলি ছোড়া হয় — যা গোলাবারুদ প্রায় শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত থামেনি। পালানোর পথ বন্ধ থাকায় মানুষ বাগানের ভেতরের কুয়োতে লাফিয়ে পড়েন — অনেকে সেখানেও প্রাণ হারান।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আজও আছে। ব্রিটিশ সরকারের হান্টার কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ৩৭৯ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে এবং প্রায় ১,২০০ জন আহত হওয়ার কথা জানায়। কিন্তু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গঠিত মদন মোহন মালবিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত তদন্ত কমিটি মৃতের সংখ্যা ৫০০-এর বেশি বলে দাবি করে, এবং কেউ কেউ দেড় হাজারের বেশি মৃত্যুর অনুমান করেছেন। Times of India-র এপ্রিল ২০২৬-এর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ১০৭ বছর পরেও শহিদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সরকারিভাবে নিশ্চিত হয়নি — জালিয়ানওয়ালাবাগ ট্রাস্টের প্রাক্তন রাজ্যসভা সদস্য তারলোচন সিং সেই তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়ে আসছেন। নিহতদের মধ্যে মাত্র সাত মাস বয়সী একটি শিশুও ছিল — এই তথ্য ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বিবরণগুলোর একটি।
রাষ্ট্রের শ্রদ্ধার্ঘ্য: নেতৃবৃন্দের বার্তা
১৩ এপ্রিল ২০২৬, শহিদ দিবসে ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতারা সামাজিক মাধ্যমে শহিদদের স্মরণ করেছেন। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁর বার্তায় বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ড দেশবাসীর মধ্যে স্বাধীনতার জন্য এক নতুন চেতনা ও দৃঢ় সংকল্প জাগিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, জাতি চিরকাল শহিদদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে এবং তাঁদের দেশপ্রেমের চেতনা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে নিষ্ঠার সঙ্গে জাতীয় সেবার পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর বার্তায় বলেছেন, শহিদদের আত্মবলিদান স্বাধীনতা, ন্যায় ও মর্যাদার মূল্যবোধ রক্ষায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সর্বদা অনুপ্রাণিত করবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ শাসনের নৃশংস চরিত্র উন্মোচিত হয়েছিল — যখন নিরস্ত্র ভারতীয়দের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। তিনি উল্লেখ করেছেন, এই ঘৃণ্য ঘটনা গোটা দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং ভগৎ সিং ও উধম সিংয়ের মতো বিপ্লবীদের হৃদয়ে স্বাধীনতার আগুন আরও প্রজ্বলিত করেছিল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, এই শহিদদের ত্যাগ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি সংজ্ঞায়িত মুহূর্ত হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় থাকবে।
স্বাধীনতার বীজ: ভগৎ সিং থেকে উধম সিং পর্যন্ত
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড কেবল একটি ট্র্যাজেডি ছিল না — এটি ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিপথ বদলে দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক মোড়। অমৃতসরের সেই হত্যালীলার খবর পেয়ে মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের পথে আরও দৃঢ় হয়েছিলেন। ভবিষ্যতের বিপ্লবী ভগৎ সিং সেদিন মাত্র বারো বছর বয়সে হত্যার পরদিন সাইকেল চালিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন এবং সেখানকার মাটি পকেটে তুলে নিয়ে প্রতিশোধের শপথ নিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
উধম সিং — যিনি সেদিন নিজেও জালিয়ানওয়ালাবাগে উপস্থিত ছিলেন — ২১ বছর পরে লন্ডনে গিয়ে সাবেক পাঞ্জাব গভর্নর মাইকেল ও’ডায়ারকে হত্যা করে শহিদদের প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁর বার্তায় এই দুই বিপ্লবীর নামোল্লেখ করে বলেছেন, জালিয়ানওয়ালাবাগই তাঁদের মধ্যে অনমনীয় সংকল্পের বীজ বপন করেছিল। ব্রিটেন আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চায়নি — ২০১৯ সালে শতবর্ষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তেরেজা মে কেবল “গভীর দুঃখ” প্রকাশ করেছিলেন।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকায় শহিদ স্মরণ: ইতিহাসের সেতু
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড পাঞ্জাবের ঘটনা হলেও এর প্রভাব অবিভক্ত ভারতের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়েছিল। বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দি জেলাও তখন ব্রিটিশ শাসনের অধীন ছিল। সিলেট বিভাগ — যার অংশ ছিল আজকের বাংলাদেশের সিলেট ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় বরাক উপত্যকা — সেখানেও রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল এবং জালিয়ানওয়ালাবাগের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যেও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়েছিল। লালা টাউনসহ হাইলাকান্দির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনে প্রতি বছর এই দিনটি স্মরণ করা হয় — কারণ ইতিহাসের এই পাঠ আজও প্রাসঙ্গিক।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের ১০৭তম বার্ষিকীতে শহিদ স্মরণ শুধু অতীতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অনুষ্ঠান নয়। এটি একটি অনুস্মারক — স্বাধীনতা কতটা মূল্যবান, এবং সেই স্বাধীনতা অর্জনে কতজন মানুষ তাঁদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। যতদিন এই দিনটি পালিত হবে, যতদিন অমৃতসরের সেই বাগানের মাটিতে মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে আসবে — ততদিন সেই ৩৭৯ বা তারও বেশি শহিদের আত্মত্যাগ ভারতের স্মৃতিতে জীবন্ত থাকবে। তাঁদের বলিদান যেন বৃথা না যায়, সেই প্রতিশ্রুতিই প্রতিটি শহিদ দিবসের মূল বার্তা।