Read today's news --> Click here

বোহাগ বিহু ২০২৬: উৎসবের আনন্দ ছাড়িয়ে আসামের নবজীবনের বার্তা কোথায়?

বোহাগ বিহু ২০২৬ এসে পৌঁছেছে ১৪ এপ্রিলের গরু বিহু ও ১৫ এপ্রিলের মানুহ বিহুর মধ্য দিয়ে — অসমীয়া নববর্ষের সূচনায় আসামজুড়ে ঢোল-পেঁপা-গগনার সুর ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এই উৎসব কি কেবল আনন্দের উপলক্ষ? এপ্রিলের শুরুতে India Today NE-র একটি বিশেষ প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে: বোহাগ বিহু ২০২৬ কি সত্যিই নতুন চিন্তার সূচনা হতে পারে? বিহুর উৎসব-আনন্দের মধ্যে কোথাও লুকিয়ে আছে আসামের হাজার বছরের ইতিহাস, গভীর সাংস্কৃতিক শিকড় এবং ভবিষ্যতের পথ খোঁজার তাগিদ।

বোহাগ: ঋতু নয়, এক জনগোষ্ঠীর স্পন্দন

‘রঙালি বিহু’ — এই নামটিই বলে দেয় উৎসবের সারাৎসার। ‘রঙালি’ শব্দটি এসেছে ‘রঙ’ বা আনন্দ থেকে। ২০২৬ সালে রঙালি বিহু বা বোহাগ বিহু ১৪ থেকে ১৫ এপ্রিল মূলত পালিত হলেও সারা মাস জুড়েই উৎসবের রেশ থাকে। আসামের কৃষি-সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত এই উৎসব ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মানুষের কাছে বহু শতাব্দী ধরে বসন্তের আগমন, বীজ বপনের সময় এবং সম্প্রদায়ের পুনর্মিলনের প্রতীক। UNESCO ২০২৩ সালে বিহুকে Intangible Cultural Heritage হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে — যা এই উৎসবের বৈশ্বিক গুরুত্বকে প্রমাণ করে।

তিনটি বিহুর মধ্যে বোহাগ বিহু সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও ব্যাপক। অক্টোবরের কঙালি বিহু বা কাটি বিহু এবং জানুয়ারির মাঘ বিহু বা ভোগালি বিহুর তুলনায় বোহাগ বিহু যৌবনের উৎসব — তরুণ-তরুণীরা বিহুর তালে মিলিত হন, বিহু নৃত্যে মেতে ওঠেন। মুগা বা পাট সিল্কের মেখেলা চাদরে সজ্জিত নৃত্যশিল্পীরা, ঢোলের বোল আর পেঁপার সুর — এই চিত্র আসামের ঐতিহ্যের সবচেয়ে চেনা ছবি। গামছা বা বিহুয়ান উপহার দিয়ে বড়দের শ্রদ্ধা জানানো, গরুকে স্নান করিয়ে নতুন দড়ি পরানো — এই রীতিগুলো কৃষিনির্ভর সমাজের হাজার বছরের স্মৃতিকে বহন করে।

কামরূপের উত্তরাধিকার নবীকরণের প্রশ্ন

বোহাগ বিহু ২০২৬ উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ রচনায় একটি প্রশ্ন কেন্দ্রীয় হয়ে উঠেছে — উৎসব কি কেবল স্মৃতির চর্চা, নাকি তা ভবিষ্যতের পথ দেখাতে পারে? আসামে ইংল্যান্ডে বসবাসকারী এক লেখক স্মরণ করেছেন ভূপেন হাজারিকার বিহুর গানের কথা। ১৯৮০-র দশকে গুয়াহাটির চাঁদমারি থেকে লতাশিল থেকে ভরালুমুখ — এক মঞ্চ থেকে আরেক মঞ্চে ছুটে বেড়ানোর সেই সন্ধ্যাগুলির কথা। হাজারিকার বিহু রচনা কেবল বিনোদন দেয়নি, সমাজের গভীরে একটা নাড়া দিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা এখন স্মৃতিতে পরিণত হলেও বোহাগ প্রতি বছর ফিরে আসে — অনুচ্চারিত কিন্তু অবিরাম।

এই প্রসঙ্গে ইতিহাসের দিকে তাকানো প্রাসঙ্গিক। কামরূপ সভ্যতা — আসামের প্রাচীনতম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেঠামো — তার উচ্চতম পর্যায়ে মোটেও প্রান্তিক ছিল না। সপ্তম শতাব্দীতে ভাস্করবর্মনের শাসনকালে কামরূপের প্রভাব বিস্তৃত ছিল পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশ থেকে পশ্চিমে করতোয়া নদী পর্যন্ত, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত। ভাস্করবর্মন হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক মিত্র ছিলেন — নালন্দার মতো বিদ্যাপীঠের সঙ্গে যে সভ্যতা-জগৎ একসূত্রে বাঁধা ছিল, তারই অংশীদার ছিলেন তিনি। চীনা পর্যটক সুয়ান ঝাং কামরূপ ভ্রমণ করে এটিকে জ্ঞান, পরিশীলন ও স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দেশ হিসেবে বর্ণনা করে গেছেন। ভাস্করবর্মনের নামে প্রচলিত ভাস্করাব্দ আজও পালিত হয় — এটি একটি বিরল সম্মান, যা প্রমাণ করে আসামের নিজস্ব কালপঞ্জি ও বৌদ্ধিক পরিচয় তৈরির ক্ষমতা ছিল। সেই ঐতিহ্য স্মরণ করা মানে কেবল অতীত রোমন্থন নয় — এটি বর্তমানের জন্য একটি দর্পণ।

বরাক উপত্যকায় বিহু: ভিন্ন ভাষা, একই উৎসবের উত্তাপ

বোহাগ বিহু মূলত ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার উৎসব হলেও সমগ্র আসামজুড়ে — হাইলাকান্দি, লালা টাউন, করিমগঞ্জ ও শিলচর সহ বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী সম্প্রদায়ের মধ্যেও এর উত্তাপ অনুভূত হয়। বরাক উপত্যকার বাসিন্দারা নিজেরা পহেলা বৈশাখ পালন করলেও অসমীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিহুর আনন্দে শামিল হওয়া এখানকার বহু পরিবারের দীর্ঘদিনের রীতি। লালা টাউনের মতো মিশ্র সাংস্কৃতিক পরিসরে বিহু ও বৈশাখ — দুটো উৎসব পাশাপাশি পালিত হওয়া এই অঞ্চলের সম্প্রীতির একটি প্রতীক।

২০২৬ সালে এই উৎসব একটু বাড়তি আবেগ বহন করছে। Pratidin Time জানাচ্ছে, এবারের রঙালি বিহু উদযাপনে জুবিন গার্গের কথা বারবার উঠে আসছে। বিহুর গান যাঁর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে, তাঁর স্মৃতি এবারের উৎসবকে শুধু আনন্দের নয়, একটু বেদনাময়ও করে তুলেছে। তাঁর সংগীত প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে বিহুর অর্থ বহন করেছে — সেই সুর এখন স্মৃতিগান হিসেবে মঞ্চ থেকে মঞ্চে বাজছে।

নবীকরণের দায়িত্ব: উৎসবের বাইরের প্রশ্ন

বোহাগ বিহু যদি সত্যিই “নতুন চিন্তার পাণ্ডুলিপির তাজা পাতা” হয় — তাহলে সেই নতুন চিন্তা কোথা থেকে আসবে? India Today NE-র রচনায় তুলে ধরা হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি: পরিচয় একটি নদীর মতো — সজীব থাকতে হলে তাকে নতুন উপনদী গ্রহণ করতে হয়। ‘স্থানীয়’ বা ‘ভূমিপুত্র’ — এই শব্দগুলোর মধ্যে গভীর আবেগ আছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো বিকাশের বিকল্প হতে পারে না। সমাজ গতিশীল, স্থির নয় — এবং বিহুর মঞ্চ শুধু সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর জায়গা নয়, এটি নেতৃত্ব গড়ে তোলার, সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার শক্তিও ধারণ করতে পারে — শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উদ্যোগ, শিল্প ও নাগরিক জীবনে।

Systems thinking-এর ভাষায় বলা যায়, বর্তমান মুহূর্তটি একটি ‘মেটাস্টেবল স্টেট’ — আপাত স্থির, কিন্তু পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে। সঠিক সময়ে সঠিক হস্তক্ষেপ বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বোহাগ বিহু ২০২৬ সেই হস্তক্ষেপের একটি সুযোগ — শুধু মাঠে ঢোলের বোলে নয়, কর্মে, উদ্যোগে এবং চিন্তায়।

বোহাগ বিহু ২০২৬-এর আনন্দ এখন তুঙ্গে। কিন্তু এই উৎসব যখন শেষ হবে, মঞ্চের আলো নিভবে — তখন কী থাকবে? কামরূপের সেই সভ্যতা তার বিদ্যা ও উদ্যমের জোরে যেমন নিজের সময়কে সংজ্ঞায়িত করেছিল, আজকের আসাম — ব্রহ্মপুত্র থেকে বরাক উপত্যকা পর্যন্ত — কি তেমনই একটি সংকল্পের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে? বোহাগের নতুন পাতায় সেই উত্তর লেখার দায়িত্ব এখন আমাদের সকলের।

বোহাগ বিহু ২০২৬: উৎসবের আনন্দ ছাড়িয়ে আসামের নবজীবনের বার্তা কোথায়?
Scroll to top