আসাম বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বে একটি নতুন বিতর্ক জাতীয় মঞ্চে পৌঁছে গেছে। গুয়াহাটি কেন্দ্র থেকে অসম জাতীয় পরিষদ (AJP)-এর প্রার্থী কুঙ্কি চৌধুরীর মা সুজাতা গুরুং চৌধুরী ১৩ এপ্রিল জাতীয় মহিলা কমিশন বা NCW-তে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন। কুঙ্কি চৌধুরীর মায়ের NCW অভিযোগে সরাসরি নাম করা হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার — নির্বাচনী প্রচারে মিথ্যা, মানহানিকর মন্তব্য করার এবং সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে হেনস্থার লক্ষ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ। India Today NE-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযোগকারী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি নিজে রাজনীতিতে সক্রিয় নন — কেবল মেয়ের প্রার্থিতার কারণেই তাঁকে এই বিতর্কের মধ্যে টেনে আনা হয়েছে।
হিমন্তের অভিযোগ ও কুঙ্কির পরিবারের জবাব
ঘটনার সূত্রপাত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে। Deccan Herald-এর বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী শর্মা ২ এপ্রিল একটি প্রচার সভার পর সাংবাদিকদের সামনে সুজাতা গুরুং চৌধুরীর সামাজিক মাধ্যমের কার্যকলাপ নিয়ে একাধিক মন্তব্য করেন। তিনি দাবি করেন, সুজাতা Instagram-এ গোমাংস ভক্ষণ-সংক্রান্ত পোস্ট শেয়ার করেছেন এবং এর মাধ্যমে “সনাতনী মানুষের ভাবাবেগে আঘাত” করেছেন। Assam Tribune-এর তথ্য অনুযায়ী, CM শর্মা আরও দাবি করেন, সুজাতা সক্রিয় UAPA মামলায় অভিযুক্ত শরজিল ইমাম ও উমর খালিদের পক্ষ নিয়ে Facebook-এ মন্তব্য করেছেন এবং পাকিস্তানকে শত্রু না ভাবার মত ব্যক্ত করেছেন।
এই অভিযোগগুলো নিয়ে NCW-তে দাখিল করা অভিযোগে সুজাতা গুরুং চৌধুরী পুরোপুরি অস্বীকৃতি জানান। বিশেষভাবে আলোচিত যে ছবিটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই ছবি সম্পর্কে তিনি জানান, সেটি আমেরিকার ডেনভার শহরের ‘ইন্টারন্যাশনাল চার্চ অব ক্যানাবিস’-এ তোলা হয়েছিল। ছবিতে দেখা বস্তুটি কোনো খাদ্যদ্রব্য নয়, বরং একটি শিল্পকর্মের অংশবিশেষ। সুজাতা NCW-তে জমা দেওয়া অভিযোগে ওই স্থানের সঙ্গে যুক্ত সংস্থা Elevation Ministries, Inc.-এর একটি সমর্থনপত্রও সংযুক্ত করেছেন, যেখানে নিশ্চিত করা হয়েছে যে বস্তুটি ছিল ফটোগ্রাফির জন্য ব্যবহৃত একটি কুশন বা বালিশ — কোনো খাবার নয়।
ডিপফেক ভিডিও, সাইবার হেনস্থা ও পরিবারের নিরাপত্তার শঙ্কা
রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি এই মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো AI-নির্মিত ডিপফেক কন্টেন্টের বিস্তার। India Today NE-র বরাতে জানা গেছে, ৪ এপ্রিল কুঙ্কি চৌধুরী নিজে পানবাজার সাইবার পুলিশ স্টেশনে একটি পৃথক অভিযোগ দায়ের করেন — যেখানে একাধিক সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে লক্ষ্য করে ডিপফেক ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। PTI-র প্রতিবেদনে কুঙ্কির অভিযোগে থাকা সরাসরি বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে: “এই ভিডিওগুলো মিথ্যাভাবে আমাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যা আমার চরিত্র, সম্মান, মর্যাদা ও নির্বাচনী সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি।”
এর বাইরেও সুজাতা গুরুং চৌধুরী NCW অভিযোগে জানিয়েছেন, তাঁর ব্যক্তিগত ছবি — এমনকি নাবালক পুত্রের সঙ্গে তোলা ছবিও — সম্মতি ছাড়া ব্যাপকভাবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, এই ঘটনায় তাঁর পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে, বিশেষত তাঁর নাবালক সন্তান। অভিযোগে AI-নির্মিত জাল কন্টেন্ট ছড়ানো, চরিত্রহনন এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের বিষয়গুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুঙ্কি চৌধুরী Devdiscourse-এর কাছে বলেছেন, যে অ্যাকাউন্টগুলো ডিপফেক কন্টেন্ট শেয়ার করেছে, তাদের অনেকের সঙ্গে শাসক BJP-র যোগসূত্র রয়েছে বলে তাঁর বিশ্বাস।
সুজাতা গুরুং চৌধুরী NCW-র কাছে একাধিক দাবি জানিয়েছেন। তিনি চান: CM-এর কথিত মানহানিকর মন্তব্য ও অনলাইন হেনস্থার তদন্ত হোক, সামাজিক মাধ্যম থেকে বিভ্রান্তিকর কন্টেন্ট সরিয়ে দেওয়া হোক, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং তাঁকে ও তাঁর নাবালক সন্তানকে সুরক্ষা দেওয়া হোক। পাশাপাশি এই অভিযোগের কপি আসামের মুখ্য সচিব, পুলিশ মহানির্দেশক এবং আসাম রাজ্য মহিলা কমিশনের সভাপতিকেও পাঠানো হয়েছে।
আসাম বিধানসভা নির্বাচন: একটি প্রসঙ্গের মধ্যে এই বিতর্ক
কুঙ্কি চৌধুরী গুয়াহাটি কেন্দ্র থেকে AJP-র প্রার্থী হিসেবে BJP-র প্রবীণ নেতা বিজয় কুমার গুপ্তার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। মাত্র ২৭ বছরের এই লন্ডনশিক্ষিত তরুণ রাজনীতিক নির্বাচনী প্রচারের পুরো পর্বে গণমাধ্যমের আলোচনায় ছিলেন। Telegraph India-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ এপ্রিল ভোটগ্রহণের পর সন্ধ্যায় তাঁর বিরুদ্ধেও আদর্শ আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে FIR দায়ের হয়েছে, এবং রাত পর্যন্ত তাঁর সামাজিক মাধ্যম দলের তিনজনকে পুলিশ আটক করেছিল। AJP এই পদক্ষেপকে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে অভিহিত করেছে। The Print-এর বরাতে জানা যায়, AJP দাবি করেছে, ভোটের ফলাফল তাদের পক্ষে যাওয়ার ইঙ্গিত পেয়ে শাসক দল “ঘাবড়ে গেছে”।
নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীর মর্যাদা ও বরাক উপত্যকার প্রাসঙ্গিকতা
এই বিতর্কটি আসামের বিধানসভা নির্বাচনে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে — নির্বাচনী প্রচারে মহিলা প্রার্থী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা কতটা মর্যাদাপূর্ণ আচরণ পাওয়ার অধিকার রাখেন? হাইলাকান্দি এবং সমগ্র বরাক উপত্যকায় এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই অঞ্চলে বাংলাভাষী সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য অংশ নারী ক্ষমতায়ন ও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে সমর্থন করেন। লালা টাউনসহ হাইলাকান্দি জেলায় নারী ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রতিটি নির্বাচনেই চোখে পড়ে।
AI-নির্মিত ডিপফেক কন্টেন্টের মাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং নারীর গোপনীয়তা লঙ্ঘন — এই দুটি বিষয় এই মামলাকে কেবল একটি রাজনৈতিক বিবাদের বাইরে নিয়ে যায়। এটি একটি সামাজিক প্রশ্নও — নির্বাচনে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার প্রবণতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
NCW এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি প্রকাশ করেনি। তবে এই অভিযোগ যেহেতু একইসঙ্গে আসামের পুলিশ মহানির্দেশক ও মুখ্য সচিবকেও পাঠানো হয়েছে, রাজ্য প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া কী হয় — তা নিয়ে আগামী কয়েক দিন নজর রাখা প্রয়োজন। ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরেও এই আইনি লড়াই চলবে বলে মনে করা হচ্ছে।