কংগ্রেস নেতা পবন খেরার আগাম জামিনের বিরুদ্ধে এবার সর্বোচ্চ আদালতে গেল আসাম সরকার। তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট ১০ এপ্রিল খেরাকে এক সপ্তাহের ট্রানজিট অ্যান্টিসিপেটরি বেইল দেওয়ার পর, আসাম সরকার ১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টে সেই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে একটি আবেদন দাখিল করেছে। আবেদনটি দাখিল করেছেন আইনজীবী শুভদীপ রায়, এবং এই সপ্তাহেই বিষয়টি শুনানির জন্য তোলা হবে বলে জানা গেছে। পবন খেরার বিরুদ্ধে আসামের গুয়াহাটি ক্রাইম ব্র্যাঞ্চ থানায় একটি মামলা রুজু রয়েছে — যে মামলার কেন্দ্রে আছে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্ত্রী রিণকি ভূঁইয়া শর্মা সম্পর্কে তাঁর কথিত বিবৃতি।
যেভাবে শুরু হল এই বিতর্ক
ঘটনার শুরু ৪ ও ৫ এপ্রিলে। কংগ্রেস নেতা পবন খেরা একটি সংবাদ সম্মেলনে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারের সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন তোলেন। NDTV-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেরার দাবি ছিল, রিণকি ভূঁইয়া শর্মা একাধিক দেশের পাসপোর্ট রাখেন এবং বিদেশে অঘোষিত সম্পদ আছে তাঁর। এর পাশাপাশি বিদেশি শেল কোম্পানির সঙ্গে যোগসূত্রের অভিযোগ এনে তিনি নির্বাচন কমিশনকে মুখ্যমন্ত্রীর প্রার্থিতা বাতিল করার দাবি জানান।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই অভিযোগে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। Times of India-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, শর্মা এই মন্তব্যগুলোকে “দূষিত, বানোয়াট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা” বলে চিহ্নিত করেন। তিনি X (সাবেক টুইটার)-এ লেখেন, “আমার স্ত্রী এবং আমি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শ্রী পবন খেরার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও দেওয়ানি উভয় মানহানির মামলা করব। তাঁকে তাঁর বেপরোয়া ও মানহানিকর বক্তব্যের জন্য পুরোপুরি দায়বদ্ধ করা হবে।” এর পরেই গুয়াহাটি ক্রাইম ব্র্যাঞ্চে মামলা দায়ের হয়।
মামলার ধারা এবং আদালতের পদক্ষেপ
গুয়াহাটি ক্রাইম ব্র্যাঞ্চ থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর একাধিক ধারায় খেরার বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়। Hindustan Times-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রযোজ্য ধারাগুলোর মধ্যে রয়েছে ধারা ১৭৫ (নির্বাচন সংক্রান্ত মিথ্যা বিবৃতি), ধারা ৩১৮ (প্রতারণা), ধারা ৩৩৭ ও ৩৩৮ (জালিয়াতি), ধারা ৩৪০ (জাল দলিল ব্যবহার), ধারা ৩৫২ (উস্কানিমূলক অপমান) এবং ধারা ৩৫৬ (মানহানি)। মামলার ব্যাপকতা দেখেই পরিষ্কার হয়, আসাম পুলিশ ও সরকার বিষয়টিকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।
মামলার মুখে পবন খেরা প্রথমে ৭ এপ্রিল তেলেঙ্গানা হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করেন, হায়দরাবাদকে তাঁর বাসস্থান দেখিয়ে। Telegraph India জানাচ্ছে, মামলায় তিনি গুয়াহাটি ক্রাইম ব্র্যাঞ্চের DCP এবং তেলেঙ্গানা সরকারকে বিবাদী হিসেবে রাখেন। তেলেঙ্গানা হাইকোর্টে শুনানির সময় আসামের অ্যাডভোকেট জেনারেল দেবজিৎ সাইকিয়া আবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। Tribune India-র বরাতে জানা যায়, সাইকিয়া যুক্তি দেন যে খেরার প্রাথমিক আবাস দিল্লিতে এবং তেলেঙ্গানা আদালতে এই মামলার রক্ষাকবচ চাওয়ার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই কারণ মামলাটি আসামের বিচারব্যবস্থার আওতাধীন।
১০ এপ্রিল তেলেঙ্গানা হাইকোর্টের বিচারক কে. সুজানা সীমিত ট্রানজিট আগাম জামিন মঞ্জুর করেন। শর্ত হিসেবে খেরাকে ব্যক্তিগত বন্ড জমা দিতে এবং তদন্তে সহযোগিতা করতে বলা হয়। NDTV জানাচ্ছে, আদালত আরও নির্দেশ দেয় যে তদন্তের জন্য প্রয়োজন হলে তিনি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উপস্থিত থাকবেন এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশ ছাড়তে পারবেন না। পাশাপাশি আদালত তাঁকে — একজন সর্বজনপরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে — প্রকাশ্যে মন্তব্যের বিষয়ে সংযত থাকার পরামর্শও দেয়।
আসাম সরকারের পাল্টা পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
তেলেঙ্গানা হাইকোর্টের আদেশে সন্তুষ্ট না হয়ে আসাম সরকার পরদিনই সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। India Today NE-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ এপ্রিল আইনজীবী শুভদীপ রায়ের মাধ্যমে দাখিল করা আবেদনে হাইকোর্টের আগাম জামিনের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। Rediff-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শুরুতে এটি ছিল একটি শব্দযুদ্ধ, কিন্তু এখন তা একটি তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
এই বিতর্কের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট স্পষ্ট — আসাম বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন এবং এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস ও BJP উভয়পক্ষই মামলাটিকে নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করতে সচেষ্ট। NewsX-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, মুখ্যমন্ত্রী শর্মা দাবি করেছেন, খেরার অভিযোগ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে “বিভ্রান্তি তৈরির” রাজনৈতিক কৌশল। কংগ্রেস পক্ষ অবশ্য এই মামলাকে “রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার” বলে অভিহিত করেছে এবং খেরার পক্ষে সংহতি প্রকাশ করেছে। Indian Awaaz জানাচ্ছে, CM শর্মা বলেছেন, “আসামের মানুষ এই ধরনের প্রচারণায় বিভ্রান্ত হবেন না।”
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার দৃষ্টিতে
এই মামলাটি কেবল গুয়াহাটি বা দিল্লির রাজনীতির বিষয় নয় — আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিতে হাইলাকান্দি, লালা টাউন এবং সমগ্র বরাক উপত্যকার ভোটারদের কাছেও এর প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। বরাক উপত্যকায় কংগ্রেসের একটি ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক আছে, বিশেষত বাংলাভাষী সম্প্রদায়ের মধ্যে। অন্যদিকে BJP বিগত বছরগুলোতে এই অঞ্চলে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। পবন খেরার মামলা ও সুপ্রিম কোর্টে আসাম সরকারের চ্যালেঞ্জ — এই আইনি লড়াই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করছে, এবং ভোটের আগে দুই দলের মধ্যে সম্পর্ক আরও তিক্ত করে তুলছে।
সুপ্রিম কোর্ট এই সপ্তাহেই আসাম সরকারের আবেদনটি শুনানিতে নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। আদালত পবন খেরার ট্রানজিট আগাম জামিন বহাল রাখবেন কিনা, নাকি সেটি স্থগিত করবেন — সেই সিদ্ধান্ত এই বিতর্কের পরবর্তী অধ্যায় নির্ধারণ করবে। একইসঙ্গে, আসামের নির্বাচনী প্রচারণায় এই মামলা কতটা ভূমিকা রাখে, সেটিও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে আগামী কয়েক সপ্তাহ।