আসামের বরখলায় একটি নবজাতক শিশু অত্যন্ত বিরল এবং গুরুতর জিনগত চর্মরোগ হার্লেকুইন ইকথিওসিস নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে। হার্লেকুইন ইকথিওসিস বিরল চর্মরোগটি বিশ্বে প্রতি ৩ লক্ষ জন্মে মাত্র একবার দেখা যায় এবং এটি নবজাতকের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক। ঘটনাটি সামনে আসার পর বরাক উপত্যকার চিকিৎসা মহলে এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা ও উদ্বেগ দুটোই বেড়েছে। শিশুটির বর্তমান চিকিৎসা অবস্থা ও পরিবারের পরিচয় বিস্তারিত এখনও জানা যায়নি, তবে চিকিৎসকরা শিশুটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
হার্লেকুইন ইকথিওসিস আসলে কী এবং কেন এটি এত বিপজ্জনক
হার্লেকুইন ইকথিওসিস বিরল চর্মরোগটি একটি অটোসোমাল রিসেসিভ জিনগত রোগ, যার মূলে রয়েছে ABCA12 জিনের মিউটেশন। এই জিনটি ত্বকের বাইরের স্তরে লিপিড (চর্বি) পরিবহনের কাজ করে — জিনটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ত্বকের স্বাভাবিক গঠন তৈরি হয় না। এর ফলে নবজাতকের সমস্ত শরীর মোটা, শক্ত, মাছের আঁশের মতো চামড়ার পুরু স্তরে ঢেকে যায়। এই পুরু স্তরে গভীর ফাটল তৈরি হয়, চোখের পাতা ও ঠোঁট সঠিকভাবে বন্ধ হয় না এবং কান চ্যাপ্টা হয়ে যায়।
শিশুর শ্বাসকষ্ট, খাদ্যগ্রহণে সমস্যা, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতাহীনতা — এই কারণগুলোই হার্লেকুইন শিশুর জীবনকে প্রথম কয়েক সপ্তাহে অত্যন্ত বিপন্ন করে তোলে। JAMA Dermatology জার্নালে প্রকাশিত ৪৫টি রোগীর উপর পরিচালিত একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, মৃত্যুর ৭৫ শতাংশ ঘটনাই জন্মের প্রথম তিন মাসের মধ্যে ঘটে — মূলত সেপসিস (রক্তে সংক্রমণ) বা শ্বাসযন্ত্রের ব্যর্থতা থেকে। ভারতে এই রোগের যতটুকু ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, তাতে দেখা গেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুরা জন্মের কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে মারা গেছে।
চিকিৎসা কী আছে: বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কতটুকু
হার্লেকুইন ইকথিওসিস বিরল চর্মরোগের কোনো স্থায়ী নিরাময় এখনও আবিষ্কৃত হয়নি — তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সহায়তায় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আগের তুলনায় অনেকটা বেড়েছে। NICU-তে (নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) আর্দ্র ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শিশুকে রাখা, নিয়মিত এমোলিয়েন্ট ক্রিম ও পেট্রোলিয়াম জেলি দিয়ে ত্বকের যত্ন নেওয়া এবং নল দিয়ে খাওয়ানো — এগুলো প্রাথমিক চিকিৎসার অংশ। সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ওরাল রেটিনয়েড থেরাপি — বিশেষত ইসোট্রেটিনোইন বা অ্যাসিট্রেটিন নামক ওষুধ।
JAMA Dermatology-র গবেষণা অনুযায়ী, যে শিশুরা ওরাল রেটিনয়েড চিকিৎসা পেয়েছে তাদের মধ্যে ৮৩ শতাংশ বেঁচে ছিল — অথচ যারা এই চিকিৎসা পায়নি তাদের মধ্যে মাত্র ২৪ শতাংশ বেঁচে ছিল। সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক বেঁচে থাকার হার এখন ৫০-৫৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। জাপানে উন্নত নবজাতক পরিচর্যা ব্যবস্থার কারণে এই হার ৮১ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে India TV News। তবে বাঁচলেও আক্রান্ত শিশুর সারাজীবন নিয়মিত চিকিৎসা ও যত্নের প্রয়োজন পড়ে — ত্বকের পুরু আঁশ নিয়মিত ঝরানো, সংক্রমণ প্রতিরোধ করা এবং চোখ ও কান সুরক্ষিত রাখা এই দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যার অংশ।
বরখলা ও বরাক উপত্যকায় এই ঘটনার গুরুত্ব
হার্লেকুইন ইকথিওসিস বিরল চর্মরোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায় কোনো সচেতনতা নেই — এমনকি বহু চিকিৎসকেরও এই রোগ নির্ণয়ের অভিজ্ঞতা নেই। বরখলার এই ঘটনাটি বরাক উপত্যকার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করছে। হাইলাকান্দি জেলায় — যেখানে লালা টাউন অবস্থিত — NICU সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালের সংখ্যা সীমিত। এই ধরনের জটিল নবজাতক রোগের চিকিৎসার জন্য সাধারণত সিলচরের শিলচর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (SMCH) বা গুয়াহাটির কোনো বড় হাসপাতালে রেফার করতে হয়।
আসামে এই রোগের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, অতীতে এই রোগটি প্রায়ই ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছে। ২০১৯ সালে সোশ্যাল মিডিয়ায় হার্লেকুইন ইকথিওসিস আক্রান্ত একটি শিশুর ভিডিও ভাইরাল হয় “দানব শিশু” শিরোনামে — যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন দাবি ছিল বলে AltNews ফ্যাক্টচেক করে প্রমাণ করেছিল। এই রোগটি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি — কারণ কুসংস্কার ও অজ্ঞতা আক্রান্ত পরিবারকে আরও বিপদে ফেলতে পারে।
এই রোগে আক্রান্ত শিশুর পরিবার যদি আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ (consanguineous marriage) থেকে জন্মানো হয়, তাহলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় আবার একই রোগ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত থাকে। এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন জেনেটিক কাউন্সেলিং এবং ABCA12 জিন পরীক্ষার উপর — যাতে পরবর্তী প্রজন্মে ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়।
কী করণীয়: পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব
বরখলার এই নবজাতকের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, বিরল রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালে উন্নত নবজাতক পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তোলা কতটা জরুরি। হার্লেকুইন ইকথিওসিস নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুটির জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেকটাই নির্ভর করছে দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার উপর — এবং সেই চিকিৎসা যত দ্রুত শুরু হবে, ফলাফল তত ভালো হওয়ার সম্ভাবনা। আসামের স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত এই ধরনের বিরল জিনগত রোগ সম্পর্কে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। শিশুটি ও তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াই এই মুহূর্তে সমাজের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।