প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৯ এপ্রিল রবিবার পশ্চিমবঙ্গের চারটি জেলায় একে একে চারটি বড় নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দিয়ে মহিলাদের রাজনীতিতে যোগদানের আহ্বান জানালেন এবং তৃণমূল কংগ্রেসকে সরাসরি “মহিলাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী” দল হিসেবে চিহ্নিত করলেন। মোদি মহিলা রাজনীতি যোগদানের এই আহ্বানটি বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে সভা দিয়ে শুরু হয়ে পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম এবং মেদিনীপুরে শেষ হয় — একই দিনে চারটি জনসভা করে মোদি পুরো জঙ্গলমহল অঞ্চল চষে ফেলেন। লোকসভায় মহিলা সংরক্ষণ সংশোধনী বিল পরাজয়ের পর এই চার সভাকে BJP-র পাল্টা আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিষ্ণুপুর ও পুরুলিয়ায় মোদির মূল অভিযোগ: TMC মহিলাদের বিরুদ্ধে
বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে সভায় মোদি মহিলা রাজনীতি যোগদানের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেন, “বাংলার মহিলারা ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ চেয়েছিলেন। মোদি সেটা নিশ্চিত করেছিল। বাংলার মহিলারা চেয়েছিলেন ২০২৯ থেকে এটা চালু হোক। মোদি সেই চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু TMC চায়নি বাংলার আরও বেশি মেয়ে MLA ও MP হোক — কারণ বাংলার মেয়েরা তাদের মহাজঙ্গলরাজকে চ্যালেঞ্জ করছিল। সেই কারণে TMC কংগ্রেসের সাথে হাত মিলিয়ে চক্রান্ত করেছে।” তিনি আরও যোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা — বিশেষত মহিলা ভোটাররা — TMC-কে এই “বিশ্বাসঘাতকতার” পরিণতি ভোগ করাবেন।
পুরুলিয়ায় সভায় মোদি TMC সরকারকে “মহাজঙ্গলরাজ” বলে অভিহিত করেন এবং অভিযোগ করেন যে আদিবাসী অধ্যুষিত জেলাগুলো উন্নয়ন ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তিনি বলেন, BJP সরকার কেন্দ্রে একটি আলাদা উপজাতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় তৈরি করেছে এবং আদিবাসীদের উন্নয়নে তহবিল বরাদ্দ করেছে। তিনি TMC ও কংগ্রেসকে “আদিবাসী বিরোধী” বলেও চিহ্নিত করেন — বলেন, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর বিরুদ্ধে প্রার্থী দিয়ে এই দলগুলো প্রমাণ করেছে তারা আদিবাসী সমাজকে সম্মান দেয় না।
মোদির প্রতিশ্রুতি ও মহিলা ভোটারদের কাছে বিশেষ বার্তা
মোদি মহিলা রাজনীতি যোগদানের আহ্বানের পাশাপাশি বাঁকুড়ার সভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিও দেন। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে BJP ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার অধীনে মহিলাদের নিজস্ব বাড়ি তৈরির জন্য ১.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হবে। তিনি অভিযোগ করেন, TMC সরকার কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলোর সুবিধা পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের কাছে পৌঁছাতে দিচ্ছে না এবং উপকারভোগীদের তালিকায় অনুপ্রবেশকারীদের নাম ঢোকানো হচ্ছে।
India Today-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে মহিলা ভোটাররাই সবচেয়ে বড় নির্ধারক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন — কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধাভোগী এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে মহিলাদের মত এই নির্বাচনে মোড় নির্ধারণ করতে পারে। BJP এই বাস্তবতা বুঝেই মহিলা সংরক্ষণ বিলের পরাজয়কে, যেটাকে অনেকে সরকারের বিপর্যয় বলে দেখেছিলেন, সেটাকেই একটি আবেগময় নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত করার কৌশল নিয়েছে।
ভারতে মহিলা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বাস্তবচিত্র
মোদি মহিলা রাজনীতি যোগদানের যে আহ্বান জানিয়েছেন, তার প্রেক্ষিতে ভারতের বাস্তবতাটা একটু জানা জরুরি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মহিলা ভোটারদের অংশগ্রহণ পুরুষদের সাথে প্রায় সমান ছিল — মহিলাদের ভোটদানের হার ৬৫.৭৮ শতাংশ এবং পুরুষের ৬৫.৬০ শতাংশ। কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বে এই সাম্য নেই — ২০২৪ সালের ১৮তম লোকসভায় মাত্র ৭৪ জন মহিলা সাংসদ ছিলেন, যা মোট আসনের মাত্র ১৩.৬ শতাংশ। ২০১৯ সালের ঐতিহাসিক উচ্চতা ৭৮ আসন থেকেও এই সংখ্যা কমেছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় পরিস্থিতি কিছুটা ব্যতিক্রম হলেও সেখানেও মহিলা প্রতিনিধিত্ব ৩৩ শতাংশের অনেক নিচে। ২০২৩ সালে পাস হওয়া নারী শক্তি বন্দন আইন অনুযায়ী লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের কথা বলা হলেও, তা চালু হওয়ার আগে Delimitation প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া জরুরি। সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিলের পরাজয় সেই বাস্তবায়নকে আরও সুদূর ভবিষ্যতে ঠেলে দিয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আসাম ও বরাক উপত্যকার দৃষ্টিকোণ: লালা টাউনের মহিলাদের জন্য প্রাসঙ্গিকতা
মোদি মহিলা রাজনীতি যোগদানের এই আহ্বান পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের মাঠে দেওয়া হলেও এর প্রতিধ্বনি আসামের বরাক উপত্যকায়ও অনুভূত হচ্ছে। হাইলাকান্দি জেলা তথা লালা টাউনের বাসিন্দাদের পরিবারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের পশ্চিমবঙ্গের সাথে পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে, তাই বাংলার নির্বাচনী রাজনীতি এখানকার মানুষের কাছে পরিচিত বিষয়।
তার চেয়েও বড় কথা — মহিলা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি আসামের জন্যেও সমানভাবে প্রযোজ্য। আসামের ১২৬ আসনের বিধানসভায় মহিলা বিধায়কের সংখ্যা এখনও একক অঙ্কে। হাইলাকান্দি জেলার পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্র — লালা, আলগাপুর, হাইলাকান্দি, কাটলিছড়া ও সোনাই — এর মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোনো মহিলা বিধায়ক নেই। নারী শক্তি বন্দন আইন বাস্তবায়ন হলে এই ছবি বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে BJP-র প্রচারে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন এবং TMC-র বিরুদ্ধে মহিলা সংরক্ষণ বিষয়টি ব্যবহার করছেন।
আগামীর রাজনীতি: পশ্চিমবঙ্গ ভোটে মহিলা ফ্যাক্টর
মোদির এই চার সভার পর BJP-র পশ্চিমবঙ্গ প্রচার এখন স্পষ্টভাবে তিনটি বিষয়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে — মহিলা সংরক্ষণ বিল পরাজয়ের দায় TMC-র উপর চাপানো, আদিবাসী উন্নয়নে TMC-র ব্যর্থতার অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুফল সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। পশ্চিমবঙ্গে ২১ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা এবং ফলাফল আসবে ৪ মে। মহিলা ভোটাররা সত্যিই মোদির এই আহ্বানে সাড়া দেন কিনা — আদিবাসী ও গ্রামীণ বাংলায় সংরক্ষণ বিতর্ক কোন দলের পক্ষে যায় — সেটা বোঝা যাবে ৪ মে-র ফলাফলেই। তবে এটুকু নিশ্চিত যে মহিলা ভোটারদের মন জেতার প্রতিযোগিতায় এবার আর কোনো দলই পিছিয়ে থাকতে রাজি নয়।