Read today's news --> ⚡️Click here 

মণিপুর উপত্যকায় পাঁচ দিনের বনধে জনজীবন স্তব্ধ — দুই শিশু হত্যায় ক্ষোভ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শান্তির আহ্বান

৭ এপ্রিল বিষ্ণুপুর জেলায় একটি বোমা বিস্ফোরণে দুই মেইতেই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রতিবাদে Joint Action Committee (JAC) মণিপুরের ইম্ফল উপত্যকায় পাঁচ দিনের বনধ ডেকেছে, যা ১৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়েছে এবং ইম্ফল, বিষ্ণুপুর ও জিরিবামে স্বাভাবিক জীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। মণিপুর উপত্যকায় পাঁচ দিনের বনধের প্রভাবে পাঁচটি উপত্যকা জেলা — ইম্ফল পশ্চিম, ইম্ফল পূর্ব, থৌবাল, কাকচিং এবং বিষ্ণুপুর — জুড়ে বাজার, স্কুল, ব্যাংক, সরকারি ও বেসরকারি অফিস সব বন্ধ হয়ে গেছে এবং পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের বনধ প্রত্যাহার করে আলোচনার পথে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

এপ্রিলের বিস্ফোরণ: যে ঘটনায় উপত্যকা জ্বলে উঠল

মণিপুর উপত্যকায় পাঁচ দিনের বনধের মূলে রয়েছে ৭ এপ্রিলের একটি মর্মান্তিক ঘটনা। সেদিন বিষ্ণুপুর জেলার থাংলাওবি এলাকায় একটি বোমা বিস্ফোরণে দুই মেইতেই শিশু প্রাণ হারায়। ঘটনার পরপরই মণিপুর সরকার ইম্ফল উপত্যকার পাঁচ জেলায় মোবাইল ইন্টারনেট, ব্রডব্যান্ড, VSAT এবং VPN সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। প্রাথমিকভাবে তিন দিনের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও পরিস্থিতি না সামলানোর কারণে সরকার একাধিকবার মেয়াদ বাড়িয়ে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ইন্টারনেট বন্ধ রাখে। বিষ্ণুপুর জেলায় কারফিউও জারি হয়, যদিও সকাল ৫টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত শিথিলতা দেওয়া হয় মানুষের অত্যাবশ্যকীয় কাজের সুবিধার্থে।

ঘটনার তদন্ত করছে National Investigation Agency (NIA)। কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ এবং হামলাকারীদের তাৎক্ষণিক গ্রেফতারের দাবিতে আন্দোলনকারী মেইতেই সংগঠনগুলো পথে নেমেছে। বিভিন্ন মেইতেই নাগরিক সংগঠন বিষ্ণুপুর হামলার পাশাপাশি “কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা,” কুকি সংগঠনের সাথে “Suspension of Operations” চুক্তি বাতিল এবং মণিপুরে NRC চালু করার দাবিও তুলেছে।

বনধের প্রভাব: ইম্ফল থেকে জিরিবাম পর্যন্ত জীবন স্তব্ধ

মণিপুর উপত্যকায় পাঁচ দিনের বনধে রাজধানী ইম্ফলের অবস্থা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। রাজ্যের ব্যস্ততম বাজার কোয়াইরামবন্দ ইমা মার্কেট — যেখানে কয়েক হাজার মহিলা ব্যবসায়ী প্রতিদিন ব্যবসা করেন — সম্পূর্ণ বন্ধ। বিদ্যালয় ও কলেজে পাঠদান বন্ধ, শিক্ষার্থীরা ঘরবন্দি। পরিবহন সংকটে জরুরি চিকিৎসা সেবা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ তৈরি করা হয়েছে।

উপত্যকা জুড়ে হাজার হাজার মানুষ — বিশেষত বিপুল সংখ্যক মহিলা — প্রতিদিন বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিচ্ছেন। আন্দোলনকারীরা “টোরংলাওবির জন্য ন্যায়বিচার করো,” “প্রক্সি যুদ্ধ বন্ধ করো” এবং “মণিপুর থেকে কুকি নার্কো-সন্ত্রাসীদের বিতাড়িত করো” — এই স্লোগান দিচ্ছেন। জিরিবামেও বনধের প্রভাব পড়েছে। উল্লেখ্য, জিরিবাম জেলা আসাম সীমান্তের একেবারে কাছে এবং সেখানকার পরিস্থিতি বরাক উপত্যকার সাথে সরাসরি যোগাযোগকে প্রভাবিত করে।

মণিপুর সংঘাতের পটভূমি: ২০২৩ থেকে চলমান মেইতেই-কুকি বিভাজন

মণিপুর উপত্যকায় পাঁচ দিনের বনধ বোঝার জন্য রাজ্যের দীর্ঘ সংঘাতের প্রেক্ষাপটটা জানা জরুরি। ২০২৩ সালের মে মাসে রাজ্যে মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ভয়াবহ জাতিগত সংঘাতের সূত্রপাত হয়। মণিপুর হাইকোর্টের একটি রায়ে মেইতেইদের Scheduled Tribe (ST) মর্যাদা দেওয়ার সুপারিশ করা হলে কুকিরা প্রতিবাদে পথে নামেন। এই প্রতিবাদ সহিংসতায় রূপ নেয়, প্রথম এক সপ্তাহেই ৭৭ জন কুকি ও ১০ জন মেইতেই প্রাণ হারান। ২০২৩ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত এই সংঘাতে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং উপত্যকা ও পাহাড়ি জেলাগুলো কার্যত দুই আলাদা অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে গেছে। বিষ্ণুপুরের ৭ এপ্রিলের ঘটনা সেই দীর্ঘ সংঘাতেরই একটি নতুন অধ্যায়।

আসাম বরাক উপত্যকায় প্রভাব: জিরিবাম সীমান্তে উদ্বেগ

মণিপুর উপত্যকায় পাঁচ দিনের বনধের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে আসামের বরাক উপত্যকাতেও। মণিপুরের জিরিবাম জেলা আসামের কাছাড় জেলার সীমান্তে অবস্থিত এবং দুই রাজ্যের মধ্যে যোগাযোগ ও বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ এই এলাকা দিয়ে যায়। মণিপুরের পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠলে কাছাড়, হাইলাকান্দি এবং করিমগঞ্জে পণ্য সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। লালা টাউন ও হাইলাকান্দি জেলার ব্যবসায়ী মহলে ইতিমধ্যে উত্তর-পূর্বের জাতীয় সড়কে পণ্য পরিবহনের ধীরগতি অনুভূত হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

এছাড়া মণিপুরে আটকে পড়া আসামের বেশ কিছু শ্রমিক ও ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা বনধের কারণে ঘরে ফিরতে পারছেন না। মণিপুরে কর্মরত বরাক উপত্যকার বাসিন্দাদের পরিবারগুলো ইন্টারনেট বন্ধের কারণে তাদের প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না — যা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়েছে।

সামনের পথ: শান্তি আলোচনা নাকি দীর্ঘ অচলাবস্থা

মণিপুরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের বনধ প্রত্যাহার করে সরকারের সাথে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু মেইতেই সংগঠনগুলো জানিয়েছে, দোষীদের গ্রেফতার ও বিচার নিশ্চিত না হলে আন্দোলন চলবে। NIA তদন্ত চলছে, কিন্তু উপত্যকার মানুষ দ্রুত দৃশ্যমান ফলাফল চাইছেন। মণিপুর সংঘাত সমাধানের কোনো দ্রুত পথ এখনও দৃশ্যমান নয় — কারণ এর শিকড় গভীরে, জাতিগত পরিচয়, ভূমি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের জটিল সমীকরণে। যতদিন পর্যন্ত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মেইতেই ও কুকি দুই পক্ষকে একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমঝোতার দিকে নিয়ে যেতে না পারবে, ততদিন মণিপুর উপত্যকায় এই ধরনের বনধ ও অশান্তি ঘুরে ঘুরে আসতেই থাকবে।

মণিপুর উপত্যকায় পাঁচ দিনের বনধে জনজীবন স্তব্ধ — দুই শিশু হত্যায় ক্ষোভ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শান্তির আহ্বান
Scroll to top