আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা পশ্চিমবঙ্গের একাধিক নির্বাচনী সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে এক অস্বাভাবিক মন্তব্য করলেন — তিনি সরাসরি বললেন, “হিন্দু ভোটাররা আমাদের ব্যাপকভাবে ভোট দিচ্ছেন, আর আমি অনুপ্রবেশকারীদের আহ্বান করছি, তারা যেন আমাদেরকে ভোট না দেন।” হিমন্ত পশ্চিমবঙ্গ অনুপ্রবেশকারী প্রসঙ্গে এই মন্তব্যটি করেন আলিপুরদুয়ারের একটি জনসভায়, যেখানে তিনি BJP-র পক্ষে প্রচার করছিলেন। এই একটি মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং TMC নির্বাচন কমিশনে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও দায়ের করেছে।
আলিপুরদুয়ার থেকে কালিম্পং: হিমন্তের প্রচারের মূল সুর
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা গত কয়েক দিনে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় — আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং, কোচবিহার, শিলিগুড়ি — একের পর এক নির্বাচনী সভা করেছেন। তাঁর প্রতিটি বক্তব্যের কেন্দ্রে একটিই বিষয় — বাংলাদেশ থেকে কথিত অনুপ্রবেশ এবং মমতা ব্যানার্জির সরকারের বিরুদ্ধে এই অনুপ্রবেশে সহায়তার অভিযোগ।
কালিম্পংয়ের একটি সভায় তিনি বলেন, “মমতা ব্যানার্জি বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের জন্য বাংলার সমগ্র কোষাগার বরাদ্দ করে ফেলেছেন। ভোটের জন্য তিনি এই জমি বিক্রি করে দিয়েছেন।” তিনি আরও বলেন, আসাম ও ত্রিপুরায় BJP সরকার সফলভাবে বাংলাদেশি মুসলিমদের প্রবেশ ঠেকিয়েছে — কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মমতা সরকার সীমান্ত সুরক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ। হিমন্ত সরাসরি বলেছেন, “আমাদের একমাত্র উদ্বেগ হল বাংলাদেশিদের কেন দেশে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। মমতা ব্যানার্জি আমাদের তাদের আটকাতে দেন না। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত বেড়া দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”
হিমন্ত পশ্চিমবঙ্গ অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতে কার্যত নিজের রাজ্য আসামকে রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তিনি দাবি করেছেন, আসামে তাঁর সরকার NRC প্রক্রিয়া এবং কঠোর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনুপ্রবেশের সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে। এছাড়া তিনি বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে BJP ক্ষমতায় এলে আসাম, ত্রিপুরা ও বাংলার সমস্ত অনুপ্রবেশকারীকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে — এই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
TMC-র পাল্টা: নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ, বিবৃতিকে ‘উসকানিমূলক’ আখ্যা
হিমন্তের এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। TMC নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করে বলেছে, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মন্তব্যগুলো “সাম্প্রদায়িকভাবে উদ্দীপক, উসকানিমূলক এবং বিভেদসৃষ্টিকারী।” তারা অভিযোগ করেছে, আসামের CM ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভোটারদের বিভাজিত করার রাজনীতি করছেন, যা নির্বাচনী আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
TMC আরও অভিযোগ করেছে যে BJP একটি কথিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংখ্যালঘু ভোট বিভক্ত করার চেষ্টা করছে। মমতা ব্যানার্জি হিমন্তের বক্তব্যকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, বাংলার মানুষ এই ধরনের বিদ্বেষমূলক রাজনীতি গ্রহণ করবেন না। TMC-র দাবি, হিমন্তের বারবার পশ্চিমবঙ্গে এসে প্রচার করা আসলে প্রমাণ করে BJP রাজ্যে তাদের নিজস্ব নেতৃত্বের উপর ভরসা করতে পারছে না।
আসাম ও বরাক উপত্যকার সাথে যোগসূত্র: অমিত শাহের সিলেটি প্রসঙ্গ
হিমন্ত পশ্চিমবঙ্গ অনুপ্রবেশকারী বিতর্কটি আসামের বরাক উপত্যকা তথা হাইলাকান্দি জেলার মানুষের কাছেও সরাসরি প্রাসঙ্গিক। এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গের একটি সভায় সরাসরি বলেছিলেন, কংগ্রেস আসামের বরাক উপত্যকায় অবৈধ অভিবাসীদের আশ্রয় দিয়েছে এবং শ্রীভূমি (করিমগঞ্জ), সিলচর ও কাছাড় জেলাকে “প্রভাবশালী” করে তুলেছে। এই বক্তব্য বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
লালা টাউন ও হাইলাকান্দির মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে অনুপ্রবেশের বিষয়টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক ও নিরাপত্তা প্রশ্ন হিসেবে দেখে আসছেন। আসামে এবং পাশের পশ্চিমবঙ্গে একই সময়ে নির্বাচন চলায় অনুপ্রবেশ ইস্যুটি দুই রাজ্যের প্রচারেই কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিয়েছে। হিমন্ত নিজে দাবি করেছেন যে আসামে তাঁর সরকার এই ইস্যুতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে, এবং সেই অভিজ্ঞতাকে পশ্চিমবঙ্গের প্রচারে ব্যবহার করছেন।
BJP-র আত্মবিশ্বাস, বিতর্ক ও আগামীর দিকনির্দেশনা
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তাঁর একাধিক সভায় দাবি করেছেন, BJP আসামে ১০০টি এবং পশ্চিমবঙ্গে ২০০টি আসন পাবে। এটি একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে TMC ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী থাকায় এই দাবি কতটা বাস্তবে রূপান্তরিত হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সন্দিহান। হিমন্তের “অনুপ্রবেশকারীদের BJP-কে ভোট না দেওয়ার” আহ্বানটি আপাতদৃষ্টিতে বিপরীতমুখী মনে হলেও এটি আসলে একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল — তিনি স্পষ্ট করতে চেয়েছেন যে BJP হিন্দু ভোটারদের দল এবং বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের ফলাফল আসবে ৪ মে — এবং সেই ফলাফলই বলবে হিমন্তের এই আক্রমণাত্মক প্রচার কৌশল ভোটের মাঠে কতটা কার্যকর হয়েছে।