১৯ এপ্রিল রবিবার রাতের তীব্র বর্ষণে গুয়াহাটি শহরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যা দেখা দিলে কামরূপ মেট্রোপলিটান জেলা প্রশাসন সোমবার ২০ এপ্রিল সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি করেছে। গুয়াহাটি বন্যা পরিস্থিতির কারণে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (DDMA)-র পক্ষ থেকে জারি করা সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গুয়াহাটি মিউনিসিপাল কর্পোরেশন (GMC) অন্তর্ভুক্ত সম্পূর্ণ এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় শ্রেণির স্কুল, কলেজ এবং কোচিং সেন্টার ২০ এপ্রিল বন্ধ থাকবে। এই সিদ্ধান্ত আসে মূলত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে — কারণ শহরের একাধিক এলাকায় হাঁটু পরিমাণ জল জমে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়।
হাটিগাঁও থেকে অনিল নগর: গুয়াহাটির কোথায় কতটা বিপর্যয়
গুয়াহাটি বন্যা পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাটিগাঁও ও অনিল নগর এলাকা, যেখানে রাস্তায় হাঁটু সমান জল জমে সকাল থেকেই যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। Times of India-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দুই এলাকা ছাড়াও বেলটোলা ওয়্যারলেস, রুকমিণীগাঁও, বসিষ্ঠাপুর এবং নুনমাটিতেও জলমগ্নতার ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়ি এলাকায় মাটি সরে আসার শঙ্কায় কামাখ্যা ও জু রোড সংলগ্ন বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ANI-র বরাতে জানা গেছে, সরকারি নোটিশে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে ১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে গুয়াহাটিতে সংঘটিত আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির কারণেই ২০ এপ্রিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
GMC মেয়র মৃগেন শরণিয়া পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন করে জানান, “সাম্প্রতিক দিনগুলোতে শহরে ভারী বৃষ্টি হওয়ায় নিচু এলাকাগুলোতে তীব্র জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পাহাড়ের কাছে বসবাসকারীরাও সমান ঝুঁকিতে রয়েছেন, কারণ ভূমিধস ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। পাহাড় কাটার ফলে ড্রেনে পলি জমে গেছে — এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে।” আবহাওয়া দপ্তর (IMD)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে আসাম ও মেঘালয়ে আরও ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে, তাই পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
গুয়াহাটির দীর্ঘদিনের সমস্যা: জলাবদ্ধতার মূল কারণ
গুয়াহাটি বন্যা পরিস্থিতি বা জলাবদ্ধতার সমস্যা নতুন নয় — এটি দশকের পর দশক ধরে চলে আসছে। Sentinel Assam-এর একটি সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে, “গুয়াহাটিতে জলাবদ্ধতা ও বন্যার সমস্যা কোনো নতুন ঘটনা নয়। দ্রুত নগরায়ন, পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর অভাব, পুরনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পাহাড় কেটে ড্রেনে পলি জমা — এগুলোই এর মূল কারণ।” এই পরিস্থিতিতে GMC, GMDA, PWD ও জলসম্পদ বিভাগ — এই চারটি সংস্থার সমন্বয়হীনতাকেও দায়ী করা হয়েছে।
গৌহাটি হাইকোর্ট ২০২৩ সালে এই চারটি বিভাগকে এক হাজার টাকা করে জরিমানা করে এবং তাদের নিষ্ক্রিয়তার তীব্র সমালোচনা করে সরকারকে একটি প্রতিকারমূলক পরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু প্রাক-বর্ষায় ২০২৬ সালেও একই চিত্র — প্রতিটি বৃষ্টির পর শহরের নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে যাচ্ছে এবং হাজার হাজার মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। ৩১ মার্চ ২০২৬-এ প্রাক-বর্ষার প্রথম ভারী বর্ষণেও একই পরিস্থিতি হয়েছিল — তখন IMD জানিয়েছিল শহরে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ২০.৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে এবং মার্চ মাস জুড়ে মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩৫.৬ মিলিমিটার।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দিতে বন্যার শঙ্কা: সতর্ক থাকুন এখনই
গুয়াহাটি বন্যা পরিস্থিতি সরাসরি না হলেও বরাক উপত্যকা তথা হাইলাকান্দির জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। প্রতি বছর আসামের প্রাক-বর্ষা বৃষ্টি প্রথমে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় শুরু হয় এবং তারপর বরাক উপত্যকায় মৌসুম সক্রিয় হয়। এপ্রিলে গুয়াহাটিতে তীব্র বন্যা দেখা দেওয়া মানে হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ ও কাছাড়েও শীঘ্রই ভারী বৃষ্টির মৌসুম এসে পড়তে পারে।
ইতিহাস বলছে, বরাক উপত্যকায় বন্যা মানেই বিপদ। ২০২৪ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রেমালের পর বরাক নদী ও তার শাখানদী লোঙ্গাই, কুশিয়ারা, সিংলা এবং কাটাখাল বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছিল এবং কারিমগঞ্জ, কাছাড় ও হাইলাকান্দিতে দু’লাখেরও বেশি মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছিলেন। হাইলাকান্দি জেলায় বরাক ও কাটাখাল নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলো — যেমন লালা, আলগাপুর, কাটলিছড়া এলাকার নিচু অংশ — প্রতি বছর বর্ষার শুরুতেই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
Assam State Disaster Management Authority (ASDMA) ইতিমধ্যে জনগণকে সতর্ক থাকতে এবং সরকারি আবহাওয়া বার্তা অনুসরণ করতে পরামর্শ দিয়েছে। হাইলাকান্দির বাসিন্দাদের এখন থেকেই নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী আত্মীয়-স্বজনদের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখা উচিত।
নগর পরিকল্পনা ও দুর্যোগ প্রস্তুতি: সামনের পথ
গুয়াহাটি বন্যা পরিস্থিতি বারবার সামনে একই প্রশ্ন তুলে ধরছে — কখন এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে? মেয়র মৃগেন শরণিয়া স্বীকার করেছেন যে পাহাড় কাটা ও অপরিকল্পিত নগরায়নই এই বারবার বন্যার মূল কারণ। গাউহাটি হাইকোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও পরিস্থিতির বাস্তব উন্নতি দৃশ্যমান নয়। আসামের মুখ্যমন্ত্রী ও পুর প্রশাসনের কাছে দাবি একটাই — শুধু ড্রেন পরিষ্কার বা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়, দরকার দীর্ঘমেয়াদী নগর জলনিষ্কাশন পরিকল্পনা, পাহাড় কাটায় কঠোর বিধি এবং নতুন নির্মাণে বন্যা প্রতিরোধী নির্দেশিকা বাধ্যতামূলক করা। প্রাক-বর্ষায় এপ্রিলেই যদি এই অবস্থা হয়, জুন-জুলাইয়ের পূর্ণ বর্ষায় শহরের কী দশা হবে — সেই শঙ্কা এখন থেকেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।