Read today's news --> ⚡️Click here 

গুয়াহাটি ম্যানহোল মৃত্যু: বন্যার জলে ডুবে থাকা খোলা ম্যানহোলে পড়ে নারীর প্রাণহানি — GMC-র বিরুদ্ধে ক্ষোভ

১৯ এপ্রিল রবিবার রাতের তীব্র বর্ষণে গুয়াহাটি শহর যখন জলমগ্ন, তখন শহরের একটি রাস্তায় জমে থাকা বন্যার জলে সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়া একটি খোলা ম্যানহোলে পড়ে প্রাণ হারান এক মহিলা। গুয়াহাটি ম্যানহোল মৃত্যুর এই ঘটনাটি শহরের নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও শোকের জন্ম দিয়েছে — কারণ এটি কোনো অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা নয়, বরং বারবার সতর্কতা দেওয়ার পরেও প্রশাসনিক অবহেলার একটি পরিচিত ও বেদনাদায়ক পরিণতি। গুয়াহাটি মিউনিসিপাল কর্পোরেশন (GMC)-কে উন্মুক্ত ম্যানহোল ও ড্রেনের বিপদ নিয়ে বারবার সতর্ক করা হয়েছে, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি — এবার সেই অবহেলার মূল্য দিলেন একজন নিরীহ নাগরিক।

কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা: জলের নিচে লুকানো মৃত্যুফাঁদ

১৯ এপ্রিল রাতে গুয়াহাটিতে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে শহরের একাধিক এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর সমান জল জমে যায়। জলমগ্ন রাস্তায় কোথায় ম্যানহোল বা খোলা ড্রেন রয়েছে তা বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় থাকে না — সব কিছুই একই রঙের জলের নিচে ঢাকা পড়ে। ওই মহিলা যখন রাস্তা পার হচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ তিনি একটি উন্মুক্ত ম্যানহোলে পা দিয়ে ফেলেন এবং বন্যার তীব্র স্রোতে ভিতরে টেনে নেওয়া যান। স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার করার চেষ্টা করলেও দ্রুতগতির জলস্রোতে আর তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

ANI-র তথ্য অনুযায়ী, ১৯ এপ্রিলের বন্যায় পাঁচটি উপত্যকা এলাকায় — হাটিগাঁও, অনিল নগর, রুকমিণীগাঁও, বেলটোলা এবং নুনমাটিতে — তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এর মধ্যে হাটিগাঁও ও অনিল নগরে রাস্তা সম্পূর্ণ ডুবে গিয়ে যানবাহন ও পথচারী উভয়ের চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। এই জলাবদ্ধতার মধ্যেই ঘটে গুয়াহাটি ম্যানহোল মৃত্যুর এই মর্মান্তিক ঘটনা।

একা নন এই মহিলা: গুয়াহাটিতে বারবার একই ট্র্যাজেডি

গুয়াহাটিতে উন্মুক্ত ম্যানহোল ও ড্রেনে পড়ে মৃত্যু বা আহত হওয়ার ঘটনা নতুন নয় — এটি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা যা প্রতিটি বর্ষায় বারবার সামনে আসে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে জ্যোতিনগর এলাকায় আট বছর বয়সী অবিনাশ সরকার ভারী বৃষ্টির সময় একটি উন্মুক্ত ড্রেনে পড়ে যায় এবং স্রোতে ভেসে যায়। তার দেহ তিন কিলোমিটার দূরে পাওয়া যায়। সেই হৃদয়বিদারক ঘটনায় বাবা সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, “আমি তাকে ধরতে চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পারিনি।”

মাত্র ছয় মাস পরে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, আর্য নগরে একটি নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের কাছে খেলতে গিয়ে তিন বছরের শিশু সুনিত কুমার একটি উন্মুক্ত ড্রেনে পড়ে মারা যায়। সেই ঘটনায় CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মুখ্যসচিব রবি কোটাকে নির্দেশ দেন গুয়াহাটির সমস্ত উন্মুক্ত ম্যানহোল ও ড্রেনের স্যাটেলাইট সার্ভে করতে। পুলিশ সেই ঘটনায় নির্মাণ সংস্থার পরিচালক-সহ তিনজনকে গ্রেফতারও করে। কিন্তু এপ্রিল ২০২৬-এ আবার একই ঘটনা — এই মহিলার গুয়াহাটি ম্যানহোল মৃত্যু প্রমাণ করছে যে সতর্কতা ও গ্রেফতারের পরেও মূল সমস্যার সমাধান হয়নি।

২০২৫ সালের মে মাসে চান্দমারি এলাকায় একটি মেয়ে বৃষ্টির জলে ডুবে থাকা উন্মুক্ত ম্যানহোলে পড়ে যায় — সেবার পথচারীরা দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। কিন্তু এবার আর রক্ষা হয়নি। CM-এর নির্দেশ, PWD-র শোকজ নোটিশ, আদালতের রায় — কোনো কিছুই বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই আরেকটি প্রাণ চলে গেল।

GMC-দায়: অবহেলার কাঠগড়ায় শহর কর্তৃপক্ষ

GMC মেয়র মৃগেন শরণিয়া নিজেই স্বীকার করেছেন যে পাহাড় কাটার কারণে ড্রেনে পলি জমে গেছে এবং শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রতিটি ভারী বৃষ্টিতে ভেঙে পড়ছে। এর পাশাপাশি রয়েছে একটি চুরির সমস্যা — CM হিমন্ত নিজেই বলেছিলেন, ম্যানহোলের সিমেন্ট স্ল্যাবগুলো প্রায়ই চুরি হয়ে যাচ্ছে, ফলে রাস্তায় সৃষ্টি হচ্ছে মরণফাঁদ। স্থানীয় বাসিন্দা লক্ষ্যা দাস এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “আমরা প্রতিদিন এই বিপদের মুখে পড়ছি। রাতে বা বৃষ্টির সময় রাস্তায় হাঁটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, কিন্তু কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।”

গৌহাটি হাইকোর্ট ২০২৩ সালে GMC, GMDA, PWD ও জলসম্পদ বিভাগকে জরিমানা করে এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশ কার্যকর হয়নি — যার প্রমাণ দিচ্ছে গুয়াহাটি ম্যানহোল মৃত্যুর এই পুনরাবৃত্তি। পুরনো ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত নগরায়ন, পাহাড় কাটা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দায়িত্বের দ্বন্দ্ব — এই সামগ্রিক ব্যর্থতার মাশুল দিচ্ছেন গুয়াহাটির সাধারণ মানুষ।

হাইলাকান্দি বরাক উপত্যকায়ও একই বিপদ: সতর্ক থাকুন

গুয়াহাটি ম্যানহোল মৃত্যুর এই ঘটনা হাইলাকান্দি তথা বরাক উপত্যকার পৌর এলাকার বাসিন্দাদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। লালা টাউন, হাইলাকান্দি শহর, আলগাপুর, শিলচর ও করিমগঞ্জের পুরনো শহরাঞ্চলে উন্মুক্ত ড্রেন ও ম্যানহোলের সমস্যা সর্বজনবিদিত। বর্ষার শুরুতে যখন রাস্তায় জল জমে, তখন এই উন্মুক্ত ড্রেনগুলো হয়ে ওঠে দৃশ্যমান মৃত্যুফাঁদ। শিশু ও বয়স্ক মানুষেরা এই বিপদে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন।

লালা টাউনের বাজার এলাকা, বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন রাস্তা এবং নিচু এলাকার বাসিন্দাদের এখনই নিজেদের পাড়ার উন্মুক্ত ড্রেন ও ম্যানহোলগুলো চিহ্নিত করা উচিত এবং স্থানীয় পঞ্চায়েত বা পৌর কর্তৃপক্ষকে সেগুলো ঢেকে দেওয়ার জন্য জানানো উচিত। বৃষ্টির সময় জলমগ্ন রাস্তায় হাঁটার সময় সর্বদা সতর্ক থাকুন এবং শিশুদের একা বাইরে যেতে দেবেন না।

দায়বদ্ধতা ভবিষ্যতের পথ: আর কত মৃত্যুর পর ব্যবস্থা?

গুয়াহাটি ম্যানহোল মৃত্যুর ঘটনায় নাগরিক সমাজ এখন সরাসরি প্রশ্ন তুলছে — একটি শিশুর মৃত্যু, একটি মহিলার মৃত্যু, আদালতের নির্দেশ, CM-এর পরিদর্শন — এর পরেও কেন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি? উত্তর একটাই: কাঠামোগত সমস্যা ঠিক না করে শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া এই বিপদ দূর করতে পারবে না। গুয়াহাটির নগর প্রশাসনকে এখন সম্পূর্ণ শহরে একটি বাধ্যতামূলক ম্যানহোল কভার অডিট, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সংস্কার এবং বন্যার সময় পথচারীদের সতর্ক করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এই মহিলার মৃত্যু যেন নিছক একটি পরিসংখ্যান না হয়ে প্রকৃত পরিবর্তনের অনুঘটক হয়ে ওঠে — সেটাই এখন শহরের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দাবি।

গুয়াহাটি ম্যানহোল মৃত্যু: বন্যার জলে ডুবে থাকা খোলা ম্যানহোলে পড়ে নারীর প্রাণহানি — GMC-র বিরুদ্ধে ক্ষোভ
Scroll to top