অসম সরকারের উচ্চশিক্ষা বিভাগ সম্প্রতি রাজ্যের সরকারি ও প্রাদেশিকীকৃত কলেজগুলিতে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী নিয়োগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে All India Central Council of Trade Unions বা AICCTU তীব্র আপত্তি জানিয়ে সরকারকে অবিলম্বে এই নির্দেশিকা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। অসম কলেজ চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিষেধাজ্ঞার এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার পটভূমি ও সরকারি নির্দেশিকা
উচ্চশিক্ষা বিভাগের অফিস মেমোরেন্ডামে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “কোনো প্রাদেশিকীকৃত কলেজ অনুমোদিত পদ নেই এমন কোনো পদে শিক্ষক বা অশিক্ষক কর্মী নিয়োগ করতে পারবে না।” এই নির্দেশিকা লঙ্ঘিত হলে সংশ্লিষ্ট কলেজের পরিচালন সমিতির সদস্য ও অধ্যক্ষকে সরাসরি দায়ী করা হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে কলেজের অধ্যক্ষদের কাছ থেকে এই বিষয়ে Compliance Report চেয়েছে।
বিষয়টি শুধু নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। এই নির্দেশিকা কার্যকর হলে, রাজ্যের প্রায় ৩০০টি কলেজে বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক ও খণ্ডকালীন পদে কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং অশিক্ষক কর্মীরা গভীর অনিশ্চয়তায় পড়বেন বলে শিক্ষক সংগঠনগুলি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। প্রসঙ্গত, ১৯৯২ সাল থেকে সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত কলেজগুলিতে নতুন অনুমোদিত পদ সৃষ্টি হয়নি বললেই চলে। ফলে ক্রমবর্ধমান ছাত্রছাত্রীর চাহিদা পূরণ করতে কলেজগুলো বাধ্য হয়েছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পথ নিতে।
AICCTU-র প্রতিবাদ ও অসম কলেজ চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিষেধাজ্ঞার প্রভাব
AICCTU স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা এমন সময়ে এসেছে যখন রাজ্যে নিয়মিত নিয়োগ প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর গতিতে চলছে এবং অনুমোদিত পদের সংখ্যা প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অনেক কম। সংগঠনটির অভিযোগ, সরকার একদিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধ করছে, অন্যদিকে স্থায়ী নিয়োগও হচ্ছে না। এই দ্বিমুখী নীতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে মারাত্মক সংকটের মুখে ফেলবে।
অসমে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের সংকট আগেও একাধিকবার আলোচনায় এসেছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে শিক্ষামন্ত্রী রনজ পেগু ঘোষণা করেন যে রাজ্যের পলিটেকনিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলির ৭৩ জন চুক্তিভিত্তিক শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী সেই সময় বলেছিলেন, “তাঁরা অংশকালীন হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং সর্বদাই জানতেন তাঁদের চাকরি স্থায়ী নয়।” এই বক্তব্য তখনও বিরোধী দলগুলির তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
শিক্ষক সংগঠনগুলির ঐতিহাসিক প্রতিরোধ
অসম কলেজ চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া নতুন কিছু নয়। Assam College Teachers’ Association বা ACTA আগেও একইরকম নির্দেশিকার বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল। ACTA-র সাধারণ সম্পাদক হিমাংশু মারাল বলেছিলেন, “পরিচালন সমিতিগুলো যদি এই নির্দেশিকা মেনে চলে, তাহলে ৩০০টি কলেজে চুক্তিভিত্তিক শত শত শিক্ষক ও কর্মী কাজ হারাবেন — এটা হবে বিপর্যয়কর।” ACTA-র পর্যবেক্ষণ, হস্টেলের পাচক, রাতের প্রহরী ও পরিষ্কারকর্মীর জন্যও কোনো অনুমোদিত পদ নেই — ফলে কলেজের হস্টেল এবং ব্যবহারিক ক্লাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
All Assam Primary TET-Qualified Teachers’ Association এর আগেও সরকারের নিয়োগ-নীতির বিরোধিতা করে বলেছে, “আমরা বেতন-সুরক্ষাসহ শর্তহীন চাকরি স্থায়ীকরণ চাই।” ২০১২ সালে Right to Education Act-এর অধীনে যাঁদের নিয়োগ হয়েছিল, তাঁরা মনে করেন তাঁদের নিয়োগ শুরু থেকেই স্থায়ী পদে হওয়া উচিত ছিল।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রেক্ষাপটে এই সংকট
হাইলাকান্দি জেলা ও লালা টাউনের পাঠকদের জন্য এই সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রাসঙ্গিক। বরাক উপত্যকার কলেজগুলিতেও দীর্ঘদিন ধরে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীরা কাজ করে আসছেন, কারণ অনুমোদিত পদের সংখ্যা প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অনেক কম। হাইলাকান্দি জেলায় যে সরকারি ও প্রাদেশিকীকৃত কলেজগুলি রয়েছে, সেগুলিতে যদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। স্থানীয় তরুণ শিক্ষার্থীদের পঠনপাঠন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি, চুক্তিতে কাজ করা স্থানীয় শিক্ষক-কর্মীরা তাঁদের জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন।
২০২৫ সালের আগস্টে নতুন Model Degree College-এ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পুনর্নিয়োগের পরিকল্পনার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ হয়েছিল। সেখানে নতুন চুক্তিভিত্তিক প্রার্থীদের মাত্র ৫০,০০০ টাকা মাসিক বেতনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা UGC নির্দেশিকা মেনে চলে না বলে সমালোচকরা অভিযোগ তুলেছেন।
আগামী দিনে কী ঘটবে
AICCTU-র দাবি সরকার মানবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। শিক্ষামন্ত্রী রনজ পেগু এই বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেননি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারকে দুটি কাজ একসাথে করতে হবে — নতুন অনুমোদিত পদ সৃষ্টি করা এবং বিদ্যমান চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের জন্য স্থায়ীকরণের একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা। শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করে সমস্যার সমাধান হবে না — প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা না করে শূন্যস্থান তৈরি করলে শেষ ক্ষতি হবে ছাত্রছাত্রীদেরই। রাজ্যের শিক্ষা মহলে এখন সবার দৃষ্টি সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।