পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে আজ রবিবার ২৬ এপ্রিল রাজ্যজুড়ে প্রচারযুদ্ধ তুঙ্গে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন মোদী প্রচার কার্যক্রমের আওতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আজ উত্তর ২৪ পরগনা ও হুগলি জেলায় দুটি জনসভা এবং সন্ধ্যায় কলকাতায় একটি বড় রোড শো করবেন। পাল্টা মাঠে রয়েছেন TMC-র সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও — দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তাঁর একাধিক কর্মসূচি রয়েছে। এই প্রচারযুদ্ধ এখন সরাসরি BJP বনাম TMC-র সর্বোচ্চ স্তরের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
মোদীর দিনভর কর্মসূচি: ঠাকুরনগর থেকে কলকাতার রোড শো
প্রধানমন্ত্রী মোদী আজ বিকেল ২টা ১৫ মিনিট নাগাদ উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরে তাঁর প্রথম জনসভায় বক্তৃতা করবেন। ঠাকুরনগর মতুয়া সম্প্রদায়ের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। জনসভার পর তিনি মতুয়া ঠাকুর মন্দিরে দর্শন ও পূজায় অংশ নেবেন। বিকেলে মোদী হুগলি জেলার হরিপালে দ্বিতীয় জনসভায় বক্তৃতা করবেন। সন্ধ্যায় তিনি ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে পূজা দেবেন এবং সেখান থেকে কলকাতার B.K. পাল অ্যাভিনিউ থেকে খান্না ক্রসিং পর্যন্ত বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে রোড শো করবেন।
আজকের কলকাতার এই রোড শো মূলত ভবানীপুর কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত, যেখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মুখোমুখি লড়াই হবে। BJP-র একটি জাতীয় নেতার বরাতে “মোদীজির দ্বিতীয় দফার প্রচার ভবানীপুর থেকেই শেষ করার পরিকল্পনা ছিল, কারণ দলটি এই আসনে বিশেষ নজর দিচ্ছে।”
TMC-র অভিষেকের প্রচার: মাগরাহাট ও ফল্টায় জনসভা
TMC-র দিক থেকেও আজ প্রচারের ঘনঘটা। TMC সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আজ দক্ষিণ ২৪ পরগনার মাগরাহাটে একটি জনসভায় বক্তৃতা করবেন এবং ফল্টায় একটি রোড শোতে অংশ নেবেন। এই দুটি এলাকা দ্বিতীয় দফায় ভোটের মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে l অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় BJP প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ চালাচ্ছেন এবং BJP-র মহিলানীতির সমালোচনা করে নিজেদের ‘মহিলা উন্নয়নের পক্ষের দল’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই ঘোষণা করেছেন, “কে প্রার্থী দেখার দরকার নেই — সব আসনে আমিই প্রার্থী।” এর পাল্টা BJP শিবির থেকে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, “আমাদের সব প্রার্থীই মোদী।” দুই শিবিরের এই ব্যক্তিত্ববাদী রাজনীতির মুখোমুখি লড়াইয়ে TMC ও BJP উভয়ের প্রচার কৌশলই কেন্দ্রীয় নেতাদের চেহারা ও বার্তার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বিরোধী শিবিরেও প্রচারের ঢল: CPIM, কংগ্রেস ও ISF মাঠে
শুধু BJP ও TMC নয়, আজ পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন মোদী প্রচারের দিনেই বিরোধী শিবিরও সক্রিয়। CPIM, কংগ্রেস এবং ISF-ও আজ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক জনসভা ও রোড শো করছে। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া ব্লক’ পশ্চিমবঙ্গে TMC-র বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে একজোট হতে পারেনি, যার ফলে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা BJP-TMC-র মধ্যেই সীমিত থাকছে। প্রথম দফায় ৯০ শতাংশের বেশি ভোটদান রেকর্ড করা হয়েছে, যা দ্বিতীয় দফাতেও উচ্চ ভোটদানের আভাস দিচ্ছে।
আসাম ও বরাক উপত্যকার প্রাসঙ্গিকতা: বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজনীতি
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন মোদী প্রচার এবং এই রাজ্যের ভোটের ফলাফল হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে নিছক প্রতিবেশী রাজ্যের খবর নয়। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বরাক উপত্যকা ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগতভাবে নিবিড়ভাবে যুক্ত। লালা টাউন ও হাইলাকান্দির বহু পরিবারের আত্মীয়-স্বজন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বসবাস করেন। এছাড়া, মতুয়া সম্প্রদায়ের CAA-সংক্রান্ত বিষয়টি বরাক উপত্যকার হিন্দু শরণার্থী পরিবারগুলির সাথেও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। BJP সরকার এই নির্বাচনে CAA বাস্তবায়নকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে সামনে রেখেছে, যা সরাসরি আসামের নাগরিকত্ব প্রশ্নের সাথেও প্রাসঙ্গিক।
আজকের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন মোদী প্রচার কর্মসূচির ফলাফল আগামী দিনে BJP-TMC শক্তি পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হয়ে দাঁড়াবে। ঠাকুরনগরে মতুয়া সম্প্রদায়ের কাছে মোদীর পূজাপাঠ এবং মন্দির দর্শন কতটা ভোটে রূপান্তরিত হয়, আর কলকাতার রোড শো কতটা নগর ভোটারদের প্রভাবিত করে — এই দুটি বিষয় দ্বিতীয় দফায় BJP-র সাফল্যের মাপকাঠি হবে। একই সাথে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দক্ষিণ ২৪ পরগনায় প্রচার TMC-র ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখার লড়াইয়ে কতটা কার্যকর হয় — সেটাও দেখার বিষয়। পশ্চিমবঙ্গের এই ভোটযুদ্ধের ফল দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি নতুন বার্তা দেবে।