বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপনের দাবিতে নতুন উদ্যমে স্মারকলিপি পেশ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। অ্যাসাম ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরাক উপত্যকার একটি সক্রিয় নাগরিক সংগঠন সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্মারকলিপি জমা দিয়েছে। কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি — এই তিন জেলার প্রায় ৩৫ লক্ষ মানুষকে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে হলে গুয়াহাটি পর্যন্ত ৩৪৫ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিতে হয়। এই দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যাত্রা দরিদ্র বিচারপ্রার্থীদের কাছে বিচার পাওয়াকে কার্যত অসম্ভব করে তুলছে। বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্ট বেঞ্চের এই দাবি তাই নিছক প্রশাসনিক বিষয় নয় — এটি সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন।
শিলচরে হাইকোর্ট বেঞ্চ: দশকের পুরনো দাবির নতুন অধ্যায়
শিলচরে গৌহাটি হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবি বরাক উপত্যকায় কয়েক দশকের পুরনো। বার্তালিপি-র ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, শিলচর বার লাইব্রেরির এক অনুষ্ঠানে আসামের মন্ত্রী কৌশিক রাই জানান যে রাজ্য সরকার বিষয়টি নিয়ে সচেতন। তবে সচেতনতা আর বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে বড় ফারাক এখনও বিদ্যমান। আনন্দবাজারের ২০১৭ সালের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কংগ্রেস সাংসদ সুস্মিতা দেব শিলচরে গৌহাটি হাইকোর্টের পৃথক বেঞ্চ স্থাপনের জন্য লোকসভায় বেসরকারি বিল পর্যন্ত এনেছিলেন। ২০১৫ সালে গৌহাটি হাইকোর্ট শিলচরে বেঞ্চ স্থাপনের আর্জি খারিজ করে দিয়েছিল, আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে সেটিও উল্লেখ রয়েছে। সেই প্রত্যাখ্যানের পরও থামেনি আন্দোলন। ২০২৬ সালের মার্চে বার্তালিপির প্রতিবেদনে জানা যায়, নতুনভাবে “হাইকোর্ট বেঞ্চ ডিমান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি, কাছাড় জেলা ইউনিট” গঠন করা হয়েছে শিলচরের এক নাগরিক সভায়। এই ধারাবাহিকতাতেই এবার নতুন স্মারকলিপি পেশ করা হয়েছে।
গৌহাটি হাইকোর্টের বিস্তৃত এক্তিয়ার এবং বরাকের সংকট
বাংলা উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, গৌহাটি হাইকোর্ট ১৯৪৮ সালের ১ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি ভারতের সবচেয়ে বড় এক্তিয়ার এলাকার অধিকারী উচ্চ আদালত — আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা ও মিজোরাম এই আদালতের আওতাভুক্ত। এই বিশাল ভূগোলের মধ্যে কোহিমা, ইম্ফল ও আগরতলায় আলাদা বেঞ্চ রয়েছে, কিন্তু আসামের নিজস্ব ভূখণ্ডের মধ্যে বরাক উপত্যকার জন্য কোনো পৃথক বেঞ্চ নেই। অথচ শুধু বরাক উপত্যকার তিন জেলায় লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস করেন। Way2Barak-এর বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, “ন্যায়বিচারের দূরত্ব” বরাকের মানুষের কাছে দীর্ঘকাল ধরে একটি বাস্তব সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইন্ডিয়া টুডে NE-এর প্রতিবেদনে আসামের বরাক উপত্যকা উন্নয়ন বিভাগের মন্ত্রী কৌশিক রাই বলেছেন, “বরাক উপত্যকার সার্বিক উন্নয়ন আমাদের সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।” তবে বিচারব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার এখনও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের মানুষের কাছে কেন এটি জরুরি
বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্ট বেঞ্চের এই দাবি হাইলাকান্দি জেলার প্রতিটি মানুষকে সরাসরি স্পর্শ করে। লালা টাউন, কাটিগড়া, আলগাপুর বা হাইলাকান্দি শহরের একজন সাধারণ মানুষকে যদি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়, তাহলে কেবল যাতায়াতে তাঁর দুই থেকে তিন দিন নষ্ট হয় এবং হাজার হাজার টাকা খরচ হয় — যা অনেকের পক্ষেই বহন করা সম্ভব নয়। জমিজমার বিরোধ, পারিবারিক মামলা বা চাকরিজনিত আইনি সমস্যায় হাইকোর্টে যাওয়া এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় স্বপ্নের মতো। শিলচর বা বরাক উপত্যকার কাছাকাছি কোথাও বেঞ্চ স্থাপিত হলে লালা টাউনের মতো প্রান্তিক এলাকার মানুষও সহজে আইনি সহায়তা পাবেন। স্থানীয় আইনজীবীদের কর্মসংস্থানও বাড়বে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও মজবুত হবে। বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্ট বেঞ্চের দাবি কেবল আইনি নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন। স্মারকলিপি জমা পড়েছে, নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে — এখন দেখার বিষয় আসাম সরকার ও কেন্দ্র এই দাবিকে কতটা গুরুত্ব দেয়। ভারতের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে সমান বিচার পাওয়ার অধিকার দিয়েছে — সেই অধিকার নিশ্চিত করতে বরাক উপত্যকার মানুষের এই ন্যায্য দাবির বাস্তব রূপায়ণ এখন সময়ের দাবি।