উত্তর-পূর্বে বাঁশ শিল্প এখন আর শুধু গ্রামীণ জীবনের অনুষঙ্গ নয় — এটি হয়ে উঠছে উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত। ২৬ এপ্রিল, ২০২৬-এ আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সামাজিক মাধ্যম প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মান কি বাত অনুষ্ঠানের মন্তব্য শেয়ার করে উত্তর-পূর্বে বাঁশ শিল্পের দ্রুত বিকাশকে স্বাগত জানান। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, একসময় যে বাঁশ বোঝা মনে করা হত, আজ তা উদ্ভাবনের প্রতীক হয়ে উঠেছে এবং সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এটি গ্রামীণ জীবিকা ও উদ্যোক্তা মনোভাবের বিকাশ ঘটাচ্ছে।
মান কি বাতে মোদির বার্তা: ২০১৭-এর আইন বদলের গল্প
প্রধানমন্ত্রী মোদি ২৬ এপ্রিল মান কি বাতের ১৩৩তম পর্বে উত্তর-পূর্বের বাঁশ খাতের সাফল্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ব্রিটিশ আমলে প্রণীত আইনে বাঁশকে গাছের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে এটি কাটা ও পরিবহনে কড়া নিয়ম ছিল এবং মানুষ ধীরে ধীরে বাঁশের ব্যবসা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় সরকার সেই আইন সংশোধন করে বাঁশকে গাছের শ্রেণি থেকে বের করে আনে। এই পদক্ষেপের পর থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাঁশ চাষ, ব্যবসা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ দ্রুত গতি পায়। মোদি বলেন, “আজ সমগ্র উত্তর-পূর্বে বাঁশ খাত ফুলে-ফেঁপে উঠছে। মানুষ ক্রমাগত উদ্ভাবন করে এতে মূল্য সংযোজন করছে।”
তৃণমূল পর্যায়ের উদ্ভাবনকারীরা: ত্রিপুরা থেকে নাগাল্যান্ড
প্রধানমন্ত্রী মান কি বাতে বেশ কয়েকজন তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোক্তার কথা তুলে ধরেন। ত্রিপুরার গোমতী জেলার বিজয় সূত্রধার এবং দক্ষিণ ত্রিপুরার প্রদীপ চক্রবর্তী প্রযুক্তির সংমিশ্রণে বাঁশ উৎপাদনে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন — যা পণ্যের মান ও পরিমাণ দুটোই বাড়িয়েছে। নাগাল্যান্ডের দিমাপুর ও আশপাশের এলাকায় স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলো বাঁশ-ভিত্তিক খাদ্যপণ্যে মূল্য সংযোজন করছে। মিজোরামের মামিত জেলায় কিছু দল বাঁশের টিস্যু কালচার ও পলি-হাউস ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে। সিকিমে ‘লাগাস্তাল ব্যাম্বু এন্টারপ্রাইজ টিম’ বাঁশ দিয়ে হস্তশিল্প, আগরবাতি, আসবাবপত্র ও গৃহসজ্জার সামগ্রী তৈরি করছে। এই উদাহরণগুলো দিয়ে মোদি ও হিমন্ত উভয়েই বোঝাতে চেয়েছেন যে উত্তর-পূর্বে বাঁশ এখন আর কেবল কাঁচামাল নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ শিল্পচক্রের কেন্দ্রে।
আসামে বাঁশ: বিশ্বের প্রথম বায়োইথানল প্রকল্প থেকে হস্তশিল্প পর্যন্ত
আসামে বাঁশ শিল্পের গুরুত্ব শুধু ঐতিহ্যগত নয়, এটি এখন আধুনিক শিল্পনীতির কেন্দ্রে। Assam Industrial Development Corporation-এর তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সারা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণে বাঁশ সম্পদ রয়েছে এবং ভারত বিশ্বে বাঁশ সম্পদে চীনের পরেই দ্বিতীয় স্থানে। নুমালিগড় রিফাইনারি আসামে বিশ্বের প্রথম বাঁশ-ভিত্তিক ২জি বায়োইথানল কারখানা — অসম বায়োইথানল প্রাইভেট লিমিটেড — স্থাপন করেছে। এই প্রকল্পটি বছরে পাঁচ লক্ষ টন বাঁশ ক্রয় করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা সরাসরি কৃষক পরিবারগুলোর আয় বৃদ্ধি করবে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার উদ্যোগে এই প্রকল্প এগিয়ে চলেছে। পাশাপাশি আসামের চায়গাঁওয়ে একটি বাঁশ পার্কও নির্মাণাধীন রয়েছে, যা বাঁশ-সংক্রান্ত ছোট ও মাঝারি শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনে বাঁশের সম্ভাবনা
বাঁশের এই জাতীয় আলোচনা হাইলাকান্দি জেলার জন্যও সরাসরি প্রাসঙ্গিক। বরাক উপত্যকার পাহাড়-ঘেরা হাইলাকান্দি জেলায় বাঁশ ঐতিহ্যগতভাবে গৃহনির্মাণ, ঝুড়ি-চালা ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আসামের বাঁশ সম্পদ বিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজ্যের মোট বাঁশ সম্পদের ৪৭.২ শতাংশ মাত্র চারটি জেলায় কেন্দ্রীভূত। লালা টাউন ও আশপাশের গ্রামগুলোতে বাঁশ প্রক্রিয়াজাতকরণ বা হস্তশিল্পের জন্য কোনো সংগঠিত পরিকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি। কিন্তু কেন্দ্রীয় নীতির পরিবর্তন ও মুখ্যমন্ত্রীর সক্রিয় সমর্থনের প্রেক্ষাপটে এখন সরকারি সহায়তায় স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বাঁশ-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগ কর্মসূচি দাবি করার এটাই উপযুক্ত সময়। যদি নাগাল্যান্ড বা ত্রিপুরার মতো স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলো বাঁশ থেকে আয় করতে পারে, তাহলে হাইলাকান্দির গ্রামীণ পরিবারগুলোও সেই পথে হাঁটতে পারে।
২০১৭ সালের আইন সংশোধন থেকে শুরু হওয়া একটি নীতিগত পরিবর্তন আজ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দিতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদির মান কি বাতের বার্তা এবং মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তের সক্রিয় সমর্থন মিলিয়ে উত্তর-পূর্বে বাঁশ শিল্প এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর পথে। এবার দেখার বিষয়, এই জাতীয় সদিচ্ছা ও উদ্যোগ কতটা দ্রুত হাইলাকান্দির মতো প্রত্যন্ত জেলায় পৌঁছায় এবং সেখানকার সাধারণ মানুষের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারে।