Read today's news --> ⚡️Click here 

মণিপুর সংঘাত মানবিক সংকট ঘোষণা করে NESO: রাজ্য ও কেন্দ্রের কাছে জবাবদিহি ও শান্তির দাবি

মে ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া মণিপুরের জাতিগত সহিংসতা তিন বছর পরেও থামছে না — এই বাস্তবতায় উত্তর-পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় ছাত্র সংগঠন NESO (North East Students’ Organisation) মঙ্গলবার গুয়াহাটি থেকে একটি কড়া বিবৃতি দিয়ে মণিপুর সংঘাতের মানবিক সংকটকে “অত্যন্ত গুরুতর” বলে চিহ্নিত করেছে। সংগঠনটি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার উভয়কেই এই সংকট সমাধানে “গভীরভাবে উদ্বেগজনক ব্যর্থতা”র জন্য প্রকাশ্যে দায়ী করেছে। সর্বশেষ RTI তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে মাস থেকে এ পর্যন্ত মণিপুরে ৫৮,৮২১ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ২১৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

NESO-র বিবৃতি: নিরস্ত্র মানুষের উপর আক্রমণ “মানবিক মর্যাদার লঙ্ঘন”

NESO-র এই বিবৃতি এসেছে এমন এক পটভূমিতে যেখানে এপ্রিল ২০২৬-এও মণিপুরে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। NESO চেয়ারম্যান স্যামুয়েল বি. জিরওয়া বলেছেন, “নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের উপর বারবার এই হামলা মানবিক মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং শান্তিতে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের প্রতি গুরুতর হুমকি।” তিনি আরও যোগ করেছেন, “এই সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর যন্ত্রণা গোটা উত্তর-পূর্বের সম্মিলিত যন্ত্রণা।” সংগঠনটি দাবি করেছে যে যারা সহিংসতার জন্য দায়ী তাদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে, যাতে জনমানসে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরে আসে।

NESO হল উত্তর-পূর্বের আটটি প্রধান ছাত্র সংগঠনের একটি ছাতা সংগঠন — যার মধ্যে রয়েছে All Assam Students’ Union (AASU), Khasi Students’ Union, Garo Students’ Union, All Arunachal Pradesh Students’ Union, Naga Students’ Federation, All Manipur Students’ Union, Mizo Zirlai Pawl এবং Twipra Students’ Federation। এই সংগঠনগুলো উত্তর-পূর্বের প্রায় প্রতিটি জনগোষ্ঠীর ছাত্র প্রতিনিধিত্ব করে, তাই NESO-র কণ্ঠস্বর রাজনৈতিক দলের চেয়ে স্বাধীন ও ব্যাপক ভিত্তিসম্পন্ন বলে বিবেচিত হয়।

RTI-তে উঠে আসা ভয়াবহ পরিসংখ্যান

মণিপুর সংঘাতের মানবিক সংকটের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য এসেছে একটি RTI (Right to Information) আবেদনের মাধ্যমে। মণিপুর কংগ্রেস নেতা হরেশ্বর গোশওয়ামি সাত মাসের প্রচেষ্টার পর রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র বিভাগ থেকে এই তথ্য পেয়েছেন। ৩ মে ২০২৩ থেকে ৩০ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত মণিপুরে মোট ৫৮,৮২১ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং “পরিবারের পরবর্তী সদস্যকে দেওয়া অনুদান” হিসেব ধরে ২১৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে।

ক্ষয়ক্ষতির চিত্রটিও ভয়ংকর। ৭,৮৯৪টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আরও ২,৬৪৬টি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১০ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ১৭৪টি ত্রাণ শিবির চালু রয়েছে এবং মণিপুর পুলিশ হাউজিং কর্পোরেশন লিমিটেড ৩,০০০টি প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড বাড়ি নির্মাণ করেছে। তবে South Asia Terrorism Portal (SATP)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে সব মিলিয়ে সহিংসতায় কমপক্ষে ৩১৪ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১২৭ জন বেসামরিক নাগরিক। এই সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এপ্রিল ২০২৬-এও থামছে না সহিংসতা: কুকি-নাগা উত্তেজনা

মণিপুর সংঘাত মূলত উপত্যকাবাসী মেইতেই সম্প্রদায় এবং পাহাড়বাসী কুকি-জো উপজাতির মধ্যে শুরু হলেও এখন তা আরও জটিল রূপ নিয়েছে। এপ্রিল ২০২৬-এও মণিপুরে নতুন করে সহিংসতায় চারজন নিহত হয়েছেন। ১৮ এপ্রিল ২০২৬-এ উখরুল জেলার NH-202-তে সন্দেহভাজন কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় দুজন তাংখুল নাগা বেসামরিক নাগরিক নিহত হন — যাদের একজন ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় সেনাসদস্য। বিষ্ণুপুর জেলায় একটি বোমা হামলায় দুটি শিশুর মৃত্যুও সাম্প্রতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ মণিপুরের বিতর্কিত CM এন. বীরেন সিং পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। SATP-এর সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে (১৯ এপ্রিল পর্যন্ত) সাতটি পৃথক ঘটনায় ১৬ জন নিহত হয়েছেন — যদিও সংখ্যায় ২০২৪ ও ২০২৫-এর তুলনায় কম, কিন্তু হামলার নৃশংসতা ও বেসামরিকদের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

অসম ও উত্তর-পূর্বের সঙ্গে যোগসূত্র: AASU-এর ভূমিকা এবং লালার প্রাসঙ্গিকতা

মণিপুর সংঘাত মানবিক সংকট অসম তথা হাইলাকান্দি জেলার মানুষের কাছে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। NESO-র সদস্য সংগঠন AASU সরাসরি এই ঐক্যবদ্ধ বিবৃতির অংশীদার। অসমের ছাত্র সমাজ বরাবরই মণিপুরের শান্তি আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। লালা শহর ও হাইলাকান্দিতে এমন অনেক পরিবার আছেন যাদের আত্মীয়-বন্ধু শিক্ষা বা কর্মসূত্রে মণিপুরে থাকেন — তাদের নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই এই সংকট উদ্বেগ তৈরি করে।

এছাড়া মণিপুরের এই অস্থিরতা সরাসরি উত্তর-পূর্বের সামগ্রিক উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রধানমন্ত্রী মোদির “Act East, Act Fast” নীতির আওতায় মণিপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রাজ্য হওয়ার কথা — কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে সেই সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরোক্ষ প্রভাব বরাক উপত্যকার ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষেরও ক্ষতির কারণ।

মণিপুর সংঘাত মানবিক সংকটের তিন বছর পার হয়ে যাচ্ছে — অথচ স্থায়ী সমাধানের কোনো রূপরেখা এখনও স্পষ্ট নয়। NESO-র চেয়ারম্যান জিরওয়া বলেছেন, “মণিপুরে শান্তি পুনরুদ্ধার শুধু একটি আঞ্চলিক প্রয়োজনীয়তা নয়, এটি একটি নৈতিক অপরিহার্যতা।” এখন প্রশ্ন একটাই — এই নৈতিক অপরিহার্যতাকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দিতে কেন্দ্র ও রাজ্য কতটা সদিচ্ছা ও দক্ষতা দেখাতে পারে। মণিপুরের সংঘাত-ক্লান্ত মানুষ এবং গোটা উত্তর-পূর্ব সেই উত্তরের জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করবে?

মণিপুর সংঘাত মানবিক সংকট ঘোষণা করে NESO: রাজ্য ও কেন্দ্রের কাছে জবাবদিহি ও শান্তির দাবি
Scroll to top