FIFA সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সম্প্রতি ভারত সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাঁর ক্রীড়া-প্রেমের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ইনফান্তিনো-মোদি ফুটবল বৈঠকে ভারতে ফুটবলের শিকড় আরও গভীর করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। Newsonair-এর তথ্য অনুযায়ী, ইনফান্তিনো স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে প্রধানমন্ত্রী মোদির ক্রীড়ার প্রতি অনুরাগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ভারতকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে একটি শক্তিশালী গন্তব্যে পরিণত করছে। বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশে FIFA-র সম্পৃক্ততা বাড়ানোর এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক ফুটবলের দৃষ্টিভঙ্গিতেও গুরুত্বপূর্ণ।
FIFA সভাপতির সফর ও মোদির সঙ্গে বৈঠকের বিষয়বস্তু
ইনফান্তিনো মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রী মোদি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন — তিনি ক্রীড়ার একজন আন্তরিক পৃষ্ঠপোষক। তাঁর সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায় ভারতকে একটি বৈশ্বিক ক্রীড়াশক্তিতে রূপান্তরিত করার ব্যাপারে তাঁর প্রতিশ্রুতি কতটা গভীর।” FIFA প্রধানের এই মন্তব্য কেবল সৌজন্যমূলক প্রশংসা নয় — এটি একটি কৌশলগত সংকেতও বটে। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ এবং এখানে ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবলের প্রতি আগ্রহও ক্রমশ বাড়ছে। FIFA-র কাছে ভারত একটি বিশাল অনাবিষ্কৃত বাজার এবং ১.৪ বিলিয়ন মানুষকে ফুটবলের দিকে আকৃষ্ট করতে পারলে সেটি বিশ্ব ফুটবলের চেহারা বদলে দেবে।
ইনফান্তিনো-মোদি ফুটবল বৈঠকে তাঁরা All India Football Federation (AIFF)-এর সঙ্গে FIFA-র সম্পর্ক উন্নয়ন, তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবল প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বিস্তার এবং ভারতীয় ক্লাব ফুটবলকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এছাড়া India Super League (ISL)-এর মানোন্নয়ন এবং ভারতীয় জাতীয় ফুটবল দলকে FIFA র্যাংকিংয়ে ওপরে তুলে আনার রোডম্যাপও এই বৈঠকের অন্যতম আলোচনার বিষয় ছিল বলে জানা গেছে।
ভারতে ফুটবল উন্নয়নের বর্তমান চিত্র ও বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বপ্ন
ভারত বর্তমানে FIFA র্যাংকিংয়ে ১২০-এর আশেপাশে অবস্থান করছে, যা একটি ১.৪ বিলিয়ন জনগোষ্ঠীর দেশের জন্য অপ্রত্যাশিতভাবে নিম্নমানের। তবে ২০১৭ সালে ভারত FIFA Under-17 বিশ্বকাপ আয়োজন করার পর থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। ২০২২ সালে FIFA AIFF-কে সাময়িকভাবে স্থগিত করলেও পরে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৩ সালে ভারত FIFA Under-17 Women’s World Cup সফলভাবে আয়োজন করেছে, যা ভারতীয় মহিলা ফুটবলের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে।
এখন ২০৩৪ FIFA বিশ্বকাপ আয়োজনের দৌড়ে ভারতের আগ্রহ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ইনফান্তিনো-মোদি ফুটবল বৈঠক সেই দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। FIFA সভাপতির এই ভারত সফর এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারতকে FIFA আরও বড় আসরে অংশীদার করতে আগ্রহী। যদিও ২০৩৪ বিশ্বকাপ ইতোমধ্যে সৌদি আরবকে দেওয়া হয়েছে, তবুও ভবিষ্যতে কোনো আসর ভারতে আয়োজনের সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করা যাচ্ছে না।
ভারত সরকারের ক্রীড়া নীতি: Khelo India থেকে Top League পর্যন্ত
মোদি সরকার ২০১৭ সাল থেকে “Khelo India” কর্মসূচির মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এই কর্মসূচিতে সারা দেশে হাজারেরও বেশি Khelo India Centre স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে মেধাবী তরুণ ক্রীড়াবিদরা বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ, বৃত্তি ও আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন। ফুটবলেও এই কর্মসূচির আওতায় বিশেষ কেন্দ্র রয়েছে। Sports Authority of India (SAI) ফুটবল একাডেমি পরিচালনা করছে এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ফুটবল উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ছে।
ইনফান্তিনো-মোদি ফুটবল বৈঠকের প্রেক্ষাপটে FIFA-র “Forward Programme”-এর আওতায় ভারতে আরও বেশি কারিগরি সহায়তা ও অর্থায়নের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে FIFA সদস্যভুক্ত দেশগুলোকে ফুটবল অবকাঠামো, প্রশিক্ষক উন্নয়ন ও মহিলা ফুটবল বিকাশে সহায়তা দিয়ে থাকে। ভারতের মতো দেশে এই সুযোগ কাজে লাগানো গেলে আগামী এক দশকে ভারতীয় ফুটবলের চেহারা অনেকটাই বদলে যেতে পারে।
অসম ও উত্তর-পূর্বের ফুটবলে প্রভাব: হাইলাকান্দির সুযোগ
ইনফান্তিনো-মোদি ফুটবল বৈঠকের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে অসম ও উত্তর-পূর্বের ফুটবলেও। উত্তর-পূর্ব ভারত ফুটবলের দিক থেকে দেশের অন্যতম সক্রিয় অঞ্চল। মণিপুর, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ড এরই মধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক প্রতিভাবান ফুটবলার তৈরি করেছে। অসমেও ফুটবলের ঐতিহ্য দীর্ঘ — গুয়াহাটি ও ডিব্রুগড়ে ক্লাব ফুটবল বেশ সক্রিয়।
হাইলাকান্দি জেলা এবং লালা শহরে ফুটবল একটি জনপ্রিয় খেলা। বিদ্যালয় পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় টুর্নামেন্টে প্রচুর তরুণ ফুটবলার অংশ নেন। Khelo India কর্মসূচির আওতায় হাইলাকান্দি জেলায় যদি একটি বিশেষায়িত ফুটবল কেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব হয়, তাহলে এই অঞ্চলের প্রতিভাবান তরুণরা পেশাদার প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন। FIFA-র বৈশ্বিক দৃষ্টি এবং ভারত সরকারের ক্রীড়া নীতির সমন্বয় যদি সত্যিকারের তৃণমূল স্তর পর্যন্ত পৌঁছায়, তাহলে লালার মতো ছোট শহরের কোনো তরুণও একদিন জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার স্বপ্ন দেখতে পারেন।
FIFA সভাপতি ইনফান্তিনোর এই ভারত সফর এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে তাঁর বৈঠক ভারতীয় ফুটবলের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। তবে ঘোষণা থেকে বাস্তবায়নের পথ সবসময় দীর্ঘ। এখন দেখার বিষয়, AIFF ও ভারত সরকার FIFA-র সঙ্গে এই সম্পর্ককে কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে ক্রিকেট-আধিপত্যের ভারতে ফুটবলকে একটি সমান্তরাল শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে কি না। ইনফান্তিনো-মোদি ফুটবল বৈঠকের ইতিবাচক আবহের পর এই প্রত্যাশা অমূলক নয়।