টানা বৃষ্টিতে সিঙ্গলা নদীর জলস্তর হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অসমের শ্রীভূমি জেলার অনিপুরে নির্মিত অস্থায়ী পথচারী সেতু ভেসে গেছে। সিঙ্গলা নদীর সেতু ভেসে যাওয়ার এই ঘটনায় দক্ষিণ রামকৃষ্ণনগরের বেশ কয়েকটি গ্রাম — অনিপুর, তিমুখা, দুল্লভছড়া, নিবিয়া ও রাতাবাড়ি — বাইরের জগৎ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে । ২৯ এপ্রিল ২০২৬ সন্ধ্যার মধ্যে এলাকার হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। রোগী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী — সকলেই এখন সংকটে।
একের পর এক সেতু বিপর্যয়ের ইতিহাস
এটি কিন্তু শ্রীভূমির অনিপুর এলাকায় প্রথম সেতু বিপর্যয় নয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে — ঠিক এই বর্ষা মৌসুমের আগেই — অনিপুর ও রামকৃষ্ণনগরকে সংযুক্তকারী মূল পাকা সেতুটি ভেঙে পড়েছিল। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অতিরিক্ত বোঝাই দুটি বালিবাহী ডাম্পার একসঙ্গে পার হওয়ার চেষ্টা করলে সেতুটির মধ্যভাগ ধসে যায় । সেই দুর্ঘটনায় দুটি ডাম্পার, দুটি কার ও একটি মিনি ট্রাক সিঙ্গলা নদীতে পড়ে যায় এবং অন্তত চারজন পথচারী আহত হন।
সেই মূল সেতু ভাঙার পর প্রশাসন সংযোগ পুনরুদ্ধারের জন্য একটি অস্থায়ী পথচারী সেতু নির্মাণ করেছিল। কিন্তু এবার টানা বৃষ্টিতে সিঙ্গলা নদীর জলস্তর তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়ায় সেই অস্থায়ী সেতুও ভেসে গেছে। এখন নতুন একটি অস্থায়ী সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে — কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা এই কাজের ধীর গতিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সিঙ্গলা নদীর সেতু ভেসে যাওয়ায় কতটা ভোগান্তি
অনিপুর, তিমুখা, দুল্লভছড়া, নিবিয়া ও রাতাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দাদের এখন একটাই প্রশ্ন — হাসপাতাল যাবেন কীভাবে? জরুরি চিকিৎসাসেবা পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অসুস্থ রোগীকে হাতে করে নদী পেরিয়ে অথবা দীর্ঘ ঘুরপথে নিয়ে যেতে হচ্ছে — যা সময়সাপেক্ষ এবং প্রাণঘাতী ঝুঁকিপূর্ণ।
ফেব্রুয়ারিতে মূল সেতু যখন ভেঙেছিল, তখন HSLC ও HS পরীক্ষা চলছিল । সেবার শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে ব্যাপক সমস্যা হয়েছিল। এবার বর্ষার শুরুতেই সেতু না থাকায় আগামী মাসগুলোতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সংকট দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির সেতু দুর্ঘটনার পর রাতাবাড়ি বিধায়ক বিজয় মালাকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিলেন এবং শ্রীভূমি জেলার তৎকালীন জেলাশাসক প্রদীপ কুমার দ্বিবেদী বলেছিলেন যে নদীর দুই পারে নৌকার ব্যবস্থা করা হবে এবং একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে তোলা হবে । কিন্তু মাস পেরিয়ে বর্ষা এসে গেলেও স্থায়ী সেতুর কাজ শুরু না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে প্রশাসনের প্রতি তীব্র ক্ষোভ জমে উঠছে।
বরাক উপত্যকার অবকাঠামো সংকট ও হাইলাকান্দির বাস্তবতা
শ্রীভূমির এই ঘটনা আসলে বরাক উপত্যকার একটি বৃহত্তর সমস্যার প্রতিফলন। সিঙ্গলা নদীর সেতু ভেসে যাওয়ার মতো বিপর্যয় এই অঞ্চলে বারবার ঘটছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে কাছাড় জেলার শিলচর-কালাইন সড়কে হরং নদীর উপর নির্মিত সেতু ভেঙে পড়েছিল — যার ফলে বরাক উপত্যকা, ত্রিপুরা ও মিজোরামের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল ।
হাইলাকান্দি জেলা এবং লালা শহরের বাসিন্দাদের জন্যও এই প্রবণতা উদ্বেগজনক। লালা-কালাইন-শিলচর রুটে বেশ কয়েকটি ছোট সেতু ও কালভার্ট রয়েছে যেগুলো বর্ষায় চাপের মুখে পড়ে। লালা থেকে হাইলাকান্দি জেলা সদরে বা শিলচর পৌঁছাতে যে সড়কপথ ব্যবহার হয়, সেখানে বর্ষায় জলজট ও সেতু ক্ষতির ইতিহাস রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এই আশঙ্কায় থাকেন।
অসমের সেতু ও সড়ক পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা PWD (Public Works Department) বারবার সমালোচনার মুখে পড়েছে। অতিরিক্ত বোঝাই যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং দুর্বল সেতু সংস্কারের অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে। জেলাপ্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ ও কেন্দ্রীয় তহবিলের সুষ্ঠু ব্যবহার ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে সুশীল সমাজ প্রতিনিধিরা মনে করেন।
এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন — অনিপুরে নির্মাণাধীন নতুন অস্থায়ী সেতু কবে চালু হবে এবং স্থায়ী সেতু নির্মাণের কাজ আদৌ শুরু হবে কি না। শ্রীভূমি জেলা প্রশাসন ও রাজ্য সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আগামী বর্ষা মৌসুমে এই অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হবে। সিঙ্গলা নদীর সেতু ভেসে যাওয়ার পরিণতি যেন শুধু সাময়িক আপত্কালীন ব্যবস্থায় চাপা না পড়ে — এই দাবিটাই এখন এলাকার সকলের।