বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই হাইলাকান্দি জেলার লালার গাগলাছড়া এলাকায় কাটাখাল নদীর জল বৃদ্ধি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গাগলাছড়া ব্রিজ এলাকা থেকে তোলা ছবি ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাটাখাল নদীর জলস্তর ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং পরিস্থিতি নজরে রাখা হচ্ছে। কাটাখাল নদী জল বৃদ্ধির এই প্রাক-বর্ষা লক্ষণ লালা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের কাছে অতীতের বন্যার স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে। সময়মতো সতর্ক না হলে এই জলবৃদ্ধি বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে বলে স্থানীয় অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।
কাটাখাল নদীর জল বৃদ্ধি: কতটা উদ্বেগের কারণ
কাটাখাল নদী হাইলাকান্দি জেলার তিনটি প্রধান নদীর একটি — বাকি দুটি হলো ধলেশ্বরী ও বরাক। এই নদীটি বরাকের উপনদী এবং লালা সার্কেলের বেশ কয়েকটি গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত। গাগলাছড়া এলাকায় এই নদীর উপর নির্মিত ব্রিজটি লালার সঙ্গে আশপাশের গ্রামগুলোর যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নদীর জলস্তর যখন বাড়তে থাকে, তখন এই ব্রিজ এলাকাটি বন্যার প্রথম সূচক হিসেবে কাজ করে।
কাটাখাল নদীর বিপদসীমা নির্ধারিত রয়েছে এবং এই নদী বিপদসীমা অতিক্রম করলে লালা, হাইলাকান্দি ও আলগাপুর রেভিনিউ সার্কেলের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়। উত্তর-পূর্ব মহাকাশ প্রয়োগ কেন্দ্র (NESAC), মেঘালয়-এর বন্যা প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা (FLEWS) লালা সার্কেলকে কাটাখাল নদীর জলস্তর বৃদ্ধির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গাগলাছড়া ব্রিজ এলাকায় এই মুহূর্তে যে জলবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা তাই নিছক সাধারণ ঘটনা নয় — এটি আরও বড় পরিস্থিতির সম্ভাব্য পূর্বসংকেত হতে পারে।
২০২৫ সালের জুন মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর কাটাখাল ও ধলেশ্বরী নদীর বন্যায় হাইলাকান্দি জেলার ৭০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছিল এবং মোট ৫১,৬৬৩ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন — যার মধ্যে ১৭,১৯৪ জন শিশু। এই পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দেয় যে কাটাখাল নদীর জলবৃদ্ধি কতটা দ্রুত মানবিক সংকটে পরিণত হতে পারে।
অতীতের বন্যায় লালার অভিজ্ঞতা
লালা এলাকায় কাটাখাল নদীর বন্যার ইতিহাস দীর্ঘ। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, লালা সার্কেলের তসলা বাঁধ ভেঙে কাটাখালের জল নিমাইচান্দপুর সহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো প্লাবিত করেছিল — লালার লালাছড়া এলাকায় বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। একটি পুরনো প্রতিবেদনে দেখা যায়, মহনপুর বাঁধ ভেঙে লালা রেভিনিউ সার্কেলের ১১টি গ্রাম সরাসরি বন্যার কবলে পড়েছিল। নিমাইচান্দপুর, নিতানন্দপুর, তসলা, গাগলাছড়া, সুদর্শনপুর, লালামুখ, হরিণচেরা ও কালাছড়া — এই এলাকাগুলো বারবার কাটাখালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২০১৯ সালে মহনপুর বাঁধ ভেঙে যখন বন্যা হয়েছিল, তখন ৯৮ হেক্টর ফসলি জমি নষ্ট হয়েছিল এবং ১,০৩৭টি কৃষক পরিবার সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। এই ইতিহাস বলছে, কাটাখাল নদীর জলস্তর বৃদ্ধি শুরু হলে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে।
গাগলাছড়া ও লালার বাসিন্দাদের জন্য এখনই করণীয়
গাগলাছড়া ব্রিজ এলাকায় কাটাখাল নদীর জল বৃদ্ধির এই প্রাথমিক লক্ষণ দেখে এখনই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। হাইলাকান্দি জেলা প্রশাসন প্রতি বছর বন্যা মৌসুমের আগে একটি Flood Action Plan প্রস্তুত করে — ২০২৫-২৬ সালের জেলা বন্যা কর্মপরিকল্পনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, আশ্রয়কেন্দ্র নির্ধারণ এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা সক্রিয় করার কথা বলা হয়েছে।
লালার গাগলাছড়া এলাকার বাসিন্দাদের প্রতি পরামর্শ: নদীর তীর থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকুন, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও মূল্যবান জিনিসপত্র উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখুন এবং স্থানীয় পঞ্চায়েত ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। যেকোনো বন্যা পরিস্থিতিতে জাতীয় দুর্যোগ হেল্পলাইন ১০৭৮ এবং হাইলাকান্দি জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (DDMA) নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে।
বর্ষার মূল মৌসুম এখনও সম্পূর্ণরূপে শুরু হয়নি — কিন্তু গাগলাছড়ায় কাটাখাল নদীর জল বৃদ্ধির এই প্রাথমিক সংকেত উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অতীতের বারবার বন্যার অভিজ্ঞতা থেকে লালার মানুষ জানেন, প্রস্তুতি আগে থেকে না নিলে ক্ষতি অনেক বেশি হয়। জেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ — সকলে মিলে এখনই সতর্ক হলেই কেবল আসন্ন বর্ষার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। লালাবাজার.কম পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে এবং যেকোনো নতুন আপডেট পাঠকদের জানানো হবে।