অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পাসপোর্ট ও বিদেশ সম্পত্তি সংক্রান্ত মন্তব্য করে মামলায় জড়ানো কংগ্রেস নেতা পবন খেড়ার আগাম জামিনের আবেদনে ৩০ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টে বিস্তারিত শুনানি হয়েছে। পবন খেড়া সুপ্রিম কোর্টে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে তীব্র মন্তব্য করেন — তাঁর পক্ষের আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি আদালতে মুখ্যমন্ত্রীকে ‘কনস্টিটিউশনাল কাউবয়’ ও ‘কনস্টিটিউশনাল রামবো’ বলে আখ্যা দেন। বিচারপতি জে কে মহেশ্বরী ও বিচারপতি এ এস চন্দুরকরের বেঞ্চ শুনানি শেষে রায় সংরক্ষিত রেখেছেন।
কোন অভিযোগে মামলা, কীভাবে এল এখানে
এই মামলার শুরু ৫ এপ্রিল ২০২৬-এ। সেদিন নতুন দিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে পবন খেড়া দাবি করেন, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্ত্রী রিনকি ভূয়াঁ শর্মার কাছে UAE, আন্তিগুয়া-বার্বুডা এবং মিশরের তিনটি বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে এবং দুবাইতে দুটি সম্পত্তি রয়েছে যা মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। এই মন্তব্যের পরপরই রিনকি ভূয়াঁ শর্মা গুয়াহাটি ক্রাইম ব্রাঞ্চ থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর একাধিক ধারায় পবন খেড়া ও অন্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর ৭ এপ্রিল অসম পুলিশের একটি দল দিল্লি পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে খেড়ার বাসভবনে গিয়েছিল, কিন্তু তখন তাঁকে পাওয়া যায়নি। তেলাঙ্গানা হাইকোর্ট ১০ এপ্রিল তাঁকে এক সপ্তাহের ট্রানজিট আগাম জামিন দিলেও অসম পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে এবং ১৫ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট সেই জামিন স্থগিত করে দেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গৌহাটি হাইকোর্টে আবেদন করলে সেখানেও ২৪ এপ্রিল বিচারপতি পার্থিব জ্যোতি সাইকিয়া খেড়ার আগাম জামিনের আর্জি খারিজ করে দেন। এরপরই খেড়া ৩০ এপ্রিলের শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন।
‘সংবিধানের কাউবয়’ মন্তব্য কেন করা হলো
৩০ এপ্রিলের শুনানিতে খেড়ার পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি আদালতে যুক্তি দেন যে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা প্রকাশ্যে বলেছিলেন পবন খেড়া বাকি জীবন অসমের জেলে কাটাবেন — এই মন্তব্য কোনো সাংবিধানিক পদাধিকারীর পক্ষে শোভনীয় নয়। প্রসিংভি আদালতে বলেন, “ডক্টর ভিম রাও আম্বেডকর কবরে শুয়ে উল্টে যেতেন যদি জানতেন যে একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী ‘কনস্টিটিউশনাল কাউবয়’ বা ‘কনস্টিটিউশনাল রামবো’-র মতো কথা বলছেন।” তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে ‘বসের বসের বসের’ হিসেবে বর্ণনা করেন — অর্থাৎ সরকারি আইনজীবীর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রক — এবং বলেন যে বেশ কিছু ‘ছাপার অযোগ্য’ মন্তব্য করা হয়েছে।
সিংভি আরও যুক্তি দেন যে মামলার অধিকাংশ ধারাই জামিনযোগ্য, খেড়া পলাতক নন, তদন্তে বাধা দেননি এবং তিনি একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ — কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধী নন। সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার রক্ষার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “বিপুলসংখ্যক পুলিশ নিয়ে কাউকে গ্রেপ্তার করতে যাওয়া হচ্ছে — যেন সে কোনো সন্ত্রাসী।”
অসম সরকারের পাল্টা যুক্তি ও মামলার ভবিষ্যৎ
অসম সরকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা সুপ্রিম কোর্টে পাল্টা যুক্তি দেন যে পবন খেড়া মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রীর পাসপোর্টের জাল ও বিকৃত নথি প্রচার করেছেন। মেহতার দাবি, আমেরিকায় নিবন্ধিত একটি কোম্পানি সংক্রান্ত জাল নথিও পাওয়া গেছে এবং কে এই জালিয়াতিতে সহায়তা করেছে ও বিদেশি কোনো সংযোগ আছে কিনা তা জানতে হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ অপরিহার্য। Dailymotion-এ প্রকাশিত ভিডিও ক্লিপ অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নিজে বলেছিলেন পুলিশ কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে পাসপোর্টগুলো ভুয়া।
পবন খেড়া সুপ্রিম কোর্টে হিমন্ত মামলায় এই শুনানি শেষে বিচারপতিদের বেঞ্চ রায় সংরক্ষিত রেখেছেন। এই মামলাটি এখন রাজনৈতিক ও আইনি উভয় দিক থেকেই ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে এই মামলার সরাসরি ভৌগোলিক সংযোগ না থাকলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব সমগ্র অসমের মতো এই অঞ্চলেও অনুভূত হচ্ছে। অসমের মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে যে আইনি লড়াই সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে, তা রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে — সাংবিধানিক পদাধিকারীদের জন্য প্রকাশ্য মন্তব্যের সীমা কতটুকু হওয়া উচিত।
সুপ্রিম কোর্টের এই মামলার রায় যখনই আসুক, তা অসমের রাজনৈতিক পরিবেশে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। কংগ্রেসের দাবি যদি আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে পবন খেড়া জামিন পাবেন এবং মামলাটি রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত বলে প্রমাণিত হবে — আর অসম সরকারের যুক্তি যদি টেকে, তাহলে হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের পথ খুলে যাবে। দেশের রাজনৈতিক ও আইনি মহল এই রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।